ঠিকানা, ভাষা গোপন করে ঢাকামুখী চাঁপাইনবাবগঞ্জের মানুষ

রাজশাহীতে আসা চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাসিন্দাদের সহজেই চিহ্নিত করা যায় তাঁদের মুখের আঞ্চলিক ভাষা শুনে। আবার দুই জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলা রাজশাহীর গোদাগাড়ীর আঞ্চলিক ভাষায় দুই জেলার আঞ্চলিক ভাষার মিশ্রণ আছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের লকডাউন উপেক্ষা করে যাঁরা রাজশাহীর বাস, রেলওয়ে স্টেশনে আসছেন, তাঁরা বেশির ভাগই নিজেদের পরিচয় দিচ্ছেন গোদাগাড়ীর বাসিন্দা হিসেবে। কথা বলার সময় এড়িয়ে চলছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের আঞ্চলিক ভাষা।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে করোনা সংক্রমণের ব্যাপকতা ছড়িয়ে পড়ার কারণে ২৪ মে থেকে সেখানে বিশেষ লকডাউন দেওয়া হয়েছে। গত শুক্রবার এই জেলার সাতজনের শরীরে করোনার ভারতীয় ধরন পাওয়া গেছে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রায় অর্ধেকের বেশি করোনার রোগী চাঁপাইনবাবগঞ্জের। এসব কারণে জেলাটির শ্রমজীবী মানুষ নিজেদের পরিচয় গোপন করে অন্য জেলায় যাচ্ছেন।

জীবিকার তাগিদে রাজধানী ঢাকায় যাওয়ার জন্য আজ শনিবার রাজশাহীর রেল ও বাসস্টেশনে আসা এমন বেশ কয়েকজনকে পাওয়া গেল, যাঁদের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জে। আলাপচারিতার সময় শুরুতে নিজেদের ঠিকানা রাজশাহীর গোদাগাড়ী বললেও পরে প্রকৃত ঠিকানা চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলায় বলে নিশ্চিত করেছেন।

আজ শনিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রাজশাহীর শিরোইল বাস টার্মিনাল ও রেলওয়ে স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, কারও মাথার নিচে ব্যাগ, কারও কিছুই নেই। কেউ আবার আধশোয়া অবস্থায়। গরমের মধ্যে গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে বসে আছেন কেউ কেউ। তাঁদের বেশির ভাগই চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাসিন্দা। বিকল্প পথে রাজশাহীতে এসেছেন।

বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনের দুটি বটগাছের নিচে শতাধিক মানুষের দেখা পাওয়া যায়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার চর মোহনপুর এলাকার রবিউল ইসলাম (২৮)। রাজমিস্ত্রির কাজে অন্য জেলায় যাওয়ার জন্য সঙ্গে নিয়েছেন ভাগনে আক্তারুল ইসলামকে।

কথা বলার শুরুতে ঠিকানা জিজ্ঞেস করলে গোদাগাড়ীর নাম বলেন। গন্তব্য নিয়ে বিস্তারিত আলাপের একপর্যায়ে রবিউল চাঁপাইনবাবগঞ্জের আঞ্চলিক ভাষায় বলে ওঠেন, ‘লকডাউন মাইনাবাইছা কত দিন চলব, হাঁরঘেঁ তো প্যাট আছে।’ এরপর রবিউল জানান তাঁর প্রকৃত ঠিকানা।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শেষ প্রান্ত ও রাজশাহী জেলার পশ্চিম প্রান্তে গোদাগাড়ীর বালিয়াঘাটা চেকপোস্ট। সেখানে পুলিশ বাধা দিয়েছিল কি না, জানতে চাইলে রবিউল বলেন, তাঁরা অটোরিকশায় চড়ে আসছিলেন। পুলিশ থামিয়েছিল। রাজমিস্ত্রির কাজে যাওয়ার কথা বলে অনুরোধ করলে ছেড়ে দেওয়া হয়। রবিউল তিন-চার মাস আগে ঢাকা থেকে বাড়িতে এসেছিলেন।

স্টেশনের একটি বটগাছের নিচে শুয়ে ছিলেন কয়েকজন। বাড়ি কোথায়, জানতে চাইলে সবাই গোদাগাড়ীর কথা বলেন। গ্রামের নাম জানতে চাইলেও গোদাগাড়ীর কথা বলেন। একপর্যায়ে আর কোনো কথা না বলে সেখান থেকে সরে যান সবাই। আরেকটি বটগাছের নিচে সাতজনের একটি দল পাওয়া যায়।

এই দলে ছিলেন আরশাদ হোসেন (৩৭)। তিনি যাচ্ছেন নোয়াখালীতে। বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাখোরালি গ্রামে। আরশাদ বলেন, রাত তিনটার দিকে বাড়ি থেকে বের হন। অটোরিকশায় ভোর পাঁচটায় রাজশাহীতে পৌঁছান। এই দলের কাছে একা বসেছিলেন শরীফুল ইসলাম। তিনিও চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে রাজশাহীতে আসেন ঢাকায় যাওয়ার জন্য।

রেলস্টেশনে ট্রেনের অপেক্ষারত এসব যাত্রীর মধ্যে ছিল না সামাজিক দূরত্ব। মাস্কও ছিল না কারও মুখে। স্বাস্থ্যবিধি মানাতে তেমন নজরদারিও দেখা যায়নি। এমন অবস্থাতেই স্টেশন এলাকায় ট্রেনের অপেক্ষায় ছিলেন যাত্রীরা।