পুরো হ’ত্যাকা’ণ্ডের ছক আঁকেন মিন্নিই, রায়ের আগেই চাঞ্চল্যকর তথ্য

বরগুনার বহুল আ’লোচিত শাহনেওয়াজ শরীফ ওরফে রিফাত শরীফ হ’ত্যাকা’ণ্ডের রায় আগামীকাল বুধবার। ২০১৯ সালের ২৬ জুন বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে তাকে কু‌‌’পিয়ে হ’ত্যা করে তারই স্কুলজীবনের বন্ধু সাব্বির আহম্মেদ নয়ন ওরফে নয়ন ব’ন্ড ও তার সঙ্গীরা। আর এ হ’ত্যাকা’ণ্ডের ছক আঁকেন নি’হত রিফাতের স্ত্রী’ আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি।

আ’লোচিত এ মা’মলা ত’দন্ত করেন বরগুনা সদর থা’নার পরিদর্শক (ত’দন্ত) মো. হু’মায়ুন কবির। প্রায় দুই মাস ত’দন্ত শেষে গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর তিনি জে’লা ম্যাজিস্ট্রেট আ’দালতে অ’ভিযোগপত্র দাখিল করেন। অ’ভিযোগপত্রে হ’ত্যাকা’ণ্ড স’ম্পর্কে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য বেরিয়ে আসে।

মিন্নির দ্বিতীয় স্বামী রিফাত শরীফ। তাকে হ’ত্যার পরিকল্পনায় মিন্নিকে সহযোগিতা করেন প্রথম স্বামী নয়ন ব’ন্ড। কেন, কী’ভাবে, কারা রিফাত শরীফকে হ’ত্যা করেছে- তা স্পষ্ট উঠে এসেছে মা’মলার ত’দন্তে। মা’মলার ২৪ আ’সামির মধ্যে নি’হত রিফাতের স্ত্রী’ আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিসহ প্রাপ্তবয়স্ক ১০ আ’সামির বি’রুদ্ধে রায় বুধবার ঘোষণা করবে জে’লা জজ আ’দালত। এ মা’মলার প্রধান আ’সামি নয়ন ব’ন্ড ব’ন্দুকযু’দ্ধে নি’হত হয়েছেন। এছাড়া মো. মু’সা নামে এক আ’সামি এখনো পলাতক।

হ’ত্যাকা’ণ্ডের ছক তৈরি
অ’ভিযোগপত্রে বলা হয়, রিফাত শরীফ বরগুনা থা’না এলাকায় ডিশলাইনের ব্যবসা করতেন। ১ নম্বর আ’সামি নয়ন ব’ন্ড ও রিফাত শরীফ একসঙ্গে বরগুনা জিলা স্কুলে পড়ালেখা করেছেন। তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব ছিল।

২০১৭ সালে রিফাতের সঙ্গে আয়্বশা সিদ্দিকা মিন্নির প্রে’ম হয়। পরে রিফাতের মাধ্যমে তার বন্ধু নয়ন ব’ন্ডের সঙ্গে মিন্নির পরিচয় হয়। ২০১৮ সালে রিফাত শরীফ মোটরসাইকেল দুর্ঘ’টনায় আ’হত হয়ে দেড় মাস চিকিৎসাধীন ছিলেন। এ সময়ে নয়ন ব’ন্ডের সঙ্গে মিন্নির নতুন প্রে’মের স’ম্পর্ক গড়ে ওঠে।

২০১৮ সালের ১৫ অক্টোবর নয়ন ব’ন্ডের বাড়িতে পাঁচ লাখ টাকা দেনমোহরে তাকে গোপনে বিয়ে করেন মিন্নি। বিয়ের বিষয়টি গো’পন রেখে রিফাতের সঙ্গে পুরোনো প্রে’মের স’ম্পর্ক চালিয়ে যান মিন্নি। এর কিছুদিন পর আগের একটি মা’মলায় নয়ন ব’ন্ডকে কারাগারে পাঠায় আ’দালত। তাকে তালাক না দিয়েই ২০১৯ সালের ২৬ এপ্রিল রিফাতের সঙ্গে পুনরায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন মিন্নি।

অ’ভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, নয়ন ব’ন্ড জামিনে মুক্তি পেলে মিন্নি অ’ত্যন্ত চতুরভাবে দুই স্বামীর সঙ্গেই স’ম্পর্ক বজায় রাখতেন। তিনি নয়ন ব’ন্ডের বাড়িতে আসা-যাওয়া করতেন এবং তার সঙ্গে শারীরিক স’ম্পর্ক বজায় রাখতেন। এক পর্যায়ে রিফাত বিষয়টি জেনে যান এবং এ নিয়ে তাদের মধ্যে মনোমালিন্য শুরু হয়। তখন মিন্নি রিফাতের কাছে ডিভোর্স চান এবং নয়ন ব’ন্ডের কাছে ফিরে যেতে চান।

অ’ভিযোগপত্রে আরো বলা হয়, রিফাতের সঙ্গে বিয়ের আগে ২০১৯ সালের মা’র্চ মাসে নয়ন ব’ন্ড নিজের জন্ম’দিন পালন করেন। ওই জন্ম’দিনের অনুষ্ঠানে প্রধান অ’তিথি ছিলেন মিন্নি। সেই অনুষ্ঠানের ভিডিও মোবাইল ফোনে ধারণ করেছিলেন নয়ন ব’ন্ডের বন্ধু হেলাল শিকদার। এ ভিডিও তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করেন। এটি দেখে রিফাত ২৪ জুন হেলাল শিকদারকে ডেকে নিয়ে ভিডিওটি স’ম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করেন এবং তার মোবাইল ফোনটি নিয়ে যান। পরে হেলাল বিষয়টি নয়ন ব’ন্ডকে জানান। নয়ন ব’ন্ড বিষয়টি রিফাত ফরাজীকে জানান।

রিফাত ফরাজী মিন্নির স্বামী রিফাত শরীফের কাছে মোবাইল ফোনটি ফেরত চাইলে রিফাত তাকে গালাগাল করেন। বিষয়টি মিন্নিকে জানান নয়ন ব’ন্ড। এ নিয়ে মিন্নির সঙ্গে রিফাত শরীফের ঝগড়া হয় এবং এক পর্যায়ে রিফাত শরীফ মিন্নির তলপেটে লাথি মা’রেন।

এতে ক্ষুব্ধ মিন্নি প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে ফোনে ঘটনাটি নয়ন ব’ন্ডকে জানান এবং পরদিন ২৫ জুন কলেজে যাওয়ার নাম করে নয়ন ব’ন্ডের বাড়িতে যান। সেখানে মিন্নি পথের কাঁ’টা দূর করার জন্য নয়ন ব’ন্ডের সঙ্গে রিফাত শরীফকে হ’ত্যার পরিকল্পনা করেন। মিন্নির কাছ থেকে প্রস্তাব পেয়ে নয়ন ব’ন্ড ওই দিন বিকেলে বরগুনা সরকারি কলেজের শহীদ মিনারে আ’সামিদের সঙ্গে বৈঠক করে রিফাত শরীফকে হ’ত্যার পরিকল্পনা করেন। একইসঙ্গে আ’সামিদের পরদিন সকালে কলেজের সামনে উপস্থিত থাকতে বলেন।

যেভাবে রিফাতকে হ’ত্যা করা হয়
হ’ত্যাকা’ণ্ডের চাঞ্চল্যকর বর্ণনা দিয়ে অ’ভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, ২৬ জুন সকালে মিন্নি বরগুনা সরকারি কলেজের সায়েন্স বিল্ডিংয়ের সামনে গিয়ে আ’সামি রিফাত ফরাজী, রাব্বি আকন ও রিফাত হাওলাদারের সঙ্গে দেখা করেন। আ’সামিদের খালি হাতে দেখে মিন্নি বিস্ময় প্রকাশ করেন এবং রিফাত ফরাজীর কাছে জানতে চান, তারা খালি হাতে কেন এবং রিফাত শরীফকে কী’ দিয়ে মা’রবে? ওই সময় মিন্নিকে নিতে কলেজের গেটে আসেন রিফাত শরীফ। তখন মিন্নি রিফাত শরীফের সঙ্গে কলেজের গেটের সামনে রাখা মোটরসাইকেলের কাছে যান।

কিন্তু পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী গেটের আশপাশে থাকা আ’সামিদের সুযোগ করে দেয়ার উদ্দেশ্যে এবং সময়ক্ষেপণ করার জন্য মিন্নি পুনরায় কলেজে ফিরে যান। এ সময় মিন্নিকে ফেরাতে রিফাত শরীফ পেছনে পেছনে কলেজের দিকে যান। তখন রিফাত শরীফের ওপর হা’মলা করার জন্য আ’সামিদের ইশারা দেন মিন্নি। আ’সামি রিফাত ফরাজীসহ অন্যরা মিন্নির স্বামীকে জা’পটে ধরে মা’রতে মা’রতে টেনে-হিঁচড়ে ক্যালিক্স একাডেমির সামনে নিয়ে যেতে থাকেন। এ সময় মিন্নি স্বাভাবিকভাবে তাদের পেছনে হেঁটে যান।

অ’ভিযোগপত্রে আরো উল্লেখ করা হয়, আ’সামি রিফাত ফরাজী দৌড়ে গিয়ে পূর্ব পাশের দেয়ালসংলগ্ন গলির মুখে জনৈক নুরুল হকের বারান্দার টিনের চালের ওপরে রাখা ব্যাগের মধ্য থেকে দুই হাতে দুটি বগি দা নিয়ে আসেন। একই সময় আ’সামি টিকট’ক হৃদয় ও রাকিবুল হাসান রিফাত হাওলাদার দৌড়ে গিয়ে দুটি লা’ঠি নিয়ে আসেন। আ’সামি রিফাত ফরাজী একটি দা রাস্তার ওপরে রেখে অন্যটি দিয়ে রিফাত শরীফকে এলোপাতাড়ি কো’পাতে থাকেন। এ সময় রিফাত ফরাজীর হাত থেকে বগি দা নিয়ে রিফাত শরীফকে এলোপাতাড়ি কো’পাতে থাকেন নয়ন ব’ন্ড। আ’সামি রিফাত ফরাজী তখন রাস্তার ওপরে রাখা অন্য দা নিয়ে পুনরায় রিফাত শরীফকে এলোপাতাড়ি কো’পাতে থাকেন।

আ’সামি রিশান ফরাজী তখন রিফাত শরীফকে জা’পটে ধরে রাখেন। আ’সামি টিকট’ক হৃদয় ও রাকিবুল হাসান রিফাত হাওলাদার লা’ঠি হাতে হ’ত্যাকা’ণ্ড নির্বিঘ্ন করার জন্য পাহারা দেন। ওই সময় আ’সামি মোহাইমিনুল ইস’লাম, সিফাত, মো. নাজমুল হাসান, প্রিন্স মোল্লা, আবু আবদুল্লাহ রায়হান, আল কাইয়ুম রাব্বি আকন, নাঈম, অলি উল্লাহ অলি, রাকিবুল হাসান নিয়ামত, জয় চন্দ্র সরকার ওরফে চন্দন, মো. হাসান, মা’রুফ বিল্লাহ ওরফে মহিবুল্লাহ, মো. মু’সা, মা’রুফ মল্লিক ও রাতুল সিকদার জয় পাহারা দেন। আ’সামি মিন্নি শুরুতে স্বাভাবিক থাকলেও পরে দায় এড়ানোর জন্য কৌশলে রিফাতকে বাঁ’চানোর অ’ভিনয় করেন এবং শুধু নয়ন ব’ন্ডকে নিবৃত করার চেষ্টা করেন। এরপর লোকজন জড়ো হলে তারা পালিয়ে যান।

অ’ভিযোগপত্রে বলা হয়, মিন্নি ঘটনার দায় এড়াতে যেহেতু স্বামীকে বাঁ’চানোর অ’ভিনয় করেন, এ কারণে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী আ’সামিরা মিন্নিকে আ’ঘাত করেননি। এ সময় র’ক্তাক্ত রিফাত শরীফ একাই রিকশায় করে হাসপাতা’লের উদ্দেশে রওনা হলেও মিন্নিকে তখন রাস্তায় পড়ে থাকা তার ভ্যানিটি ব্যাগ ও জুতা কুড়াতে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়।

পরে মিন্নি রিকশায় করে রিফাত শরীফের সঙ্গে বরগুনা জেনারেল হাসপাতা’লে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর মুমূর্ষু রিফাত শরীফকে বরিশাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতা’লে স্থা’নান্তর করতে বলেন চিকিৎসকেরা। তখন মিন্নি তার জামাকাপড় র’ক্তে ভেজা, তাই বরিশাল যাওয়া সম্ভব নয়—এই অজুহাত দেখিয়ে নিজের বাবার বাড়িতে চলে যান এবং হ’ত্যাকা’ণ্ডের প্রধান আ’সামি নয়ন ব’ন্ডকে মোবাইল ফোনে দ্রুত নিরাপদ স্থানে পালিয়ে যাওয়ার পরাম’র্শ দেন।

অ’ভিযোগপত্রে বলা হয়, আ’সামি মিন্নি, রিফাত ফরাজী, রাশিদুল হাসান রিশান, মো. হাসান, টিকট’ক হৃদয় ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানব’ন্দি দেন। এ ছাড়া ১৬১ ধারায় রেকর্ড করা সাক্ষীদের জবানব’ন্দি, বস্তুগত প্রমাণ, সিসিটিভি ফুটেজ, সিডিআর এবং সার্বিকভাবে পারিপার্শ্বিক অবস্থাগত সাক্ষ্যে প্রাপ্ত তথ্যে আ’সামি মিন্নির বি’রুদ্ধে রিফাত শরীফ হ’ত্যাকা’ণ্ডে জ’ড়িত থাকার বিষয়টি প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে।