ঝিনাইদহে শিশু ধর্ষণের অভিযোগ, সত্যতা খুঁজতে ঘরে নিয়ে ‘পরীক্ষা’ চেয়ারম্যানের

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার রাখালগাছি ইউনিয়নের একটি গ্রামে ছয় বছরের একটি মেয়েশিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসীর কাছে ঘটনাটি শুনে ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মহিদুল ইসলাম শিশুটির বাড়িতে যান। এ সময় শিশুটির মা তাঁকে বলেন, গ্রামের নুর মোহাম্মদের ছেলে সেলিম হোসেন (৪৫) তাঁর মেয়েকে জোরপূর্বক আটকে ধর্ষণ করেছেন। ইউপি চেয়ারম্যান ধর্ষণের অভিযোগ সত্য কি না, তা নিজে পরীক্ষা করে দেখবেন বলে জানান। তিনি শিশুটিকে একটি ঘরের ভেতর নিয়ে পরীক্ষা করেন। পরীক্ষা করে কিছুই পাননি বলে ঘর থেকে বেরিয়ে জানান।

বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য বিকেলে ইউপি ভবনে সালিস ডাকেন। সেখানে উভয় পক্ষকে থাকতে বলেন। বিকেলে উভয় পক্ষকে নিয়ে বসে অভিযুক্ত সেলিম হোসেনকে ৮০ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ইউপি চেয়ারম্যান মহিদুল। ভুক্তভোগী পরিবার থানায় যেতে চাইলে চেয়ারম্যান এই মীমাংসা মেনে নিয়ে ঘটনাটি এখানেই শেষ করার জন্য ভুক্তভোগী পক্ষকে বলেন।

পরে ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফেসবুকে চাঞ্চল্য তৈরি করলে থানা-পুলিশের নজরে আসে। তাদের সহযোগিতায় শিশুটির মা বাদী হয়ে অবশেষে গতকাল মঙ্গলবার গভীর রাতে কালীগঞ্জ থানায় মামলা করেছেন। মামলার পরপরই পুলিশ অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত সেলিম হোসেনকে গ্রেপ্তার করেছে। কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহা. মাহফুজুর রহমান মিয়া বলেন, ধর্ষণের ঘটনা নিয়ে থানায় মামলা হয়েছে। তাঁরা আজ বুধবার সকালে আসামিকে গ্রেপ্তার করে দুপুরে আদালতে পাঠান। আদালত আসামিকে কারাগারে পাঠিয়ে দিয়েছেন।

শিশুটির মা সাংবাদিকদের বলেন, গত শুক্রবার পান আনার জন্য তিনি তাঁর ৬ বছরের শিশুকন্যাকে সেলিম হোসেনের বাড়িতে পাঠান। অনেকক্ষণ পরও মেয়ে ফিরছে না দেখে তিনি এগিয়ে যান। কিছুক্ষণ পর মেয়েকে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে বাড়ি ফিরতে দেখেন। কী হয়েছে জিজ্ঞেস করতেই তিনি মেয়ের পরনের পোশাক ভেজা দেখতে পান। মেয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে, ‘সেলিম চাচা মুখ চেপে ধরে কী সব করছিল।’ এ কথা শুনে তিনি তৎক্ষণাৎ সেলিমের বাড়িতে যান এবং তাঁকে কী করেছেন জিজ্ঞাসা করেন। তখন সেলিম ঘামতে শুরু করেন।

শিশুটির মা বলেন, বিষয়টি দ্রুত প্রতিবেশীরা জেনে যান। তাঁরা স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মহিদুল ইসলামকে অবহিত করেন। চেয়ারম্যান বিষয়টি দেখছেন জানিয়ে কিছুক্ষণ পরই তাঁর বাড়িতে আসেন। তিনি শিশুটিকে একটি ঘরের মধ্যে নিয়ে পরীক্ষা করেন। এরপর বলেন, ধর্ষণের কোনো আলামত তিনি পাননি। তারপরও বিষয়টি তিনি দেখবেন বলে চলে যান। পরে ওই দিন বিকেলেই ইউনিয়ন পরিষদে এক সালিসে অভিযুক্ত সেলিমকে ৮০ হাজার টাকা জরিমানা করেন। জরিমানার টাকা দ্রুত পরিশোধ করতে বলে সালিস নিষ্পত্তি করা হয়। যদিও তাঁরা বুধবার দুপুর পর্যন্ত কোনো টাকা পাননি বলে জানান।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত সেলিম হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত না। তা ছাড়া চেয়ারম্যান মেয়েটিকে চেক করে দেখেছেন, কিছুই পাননি। তারপরও সালিসে আমাদের ৮০ হাজার টাকা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। আমি ইতিমধ্যে চেয়ারম্যান মহিদুল ইসলামের কাছে ৫০ হাজার টাকা দিয়েছি। বাকি ৩০ হাজার টাকা দেওয়ার জন্য সময় নিয়েছি।’

স্থানীয় ইউপি সদস্য আবুল হাসেম বলেন, ঘটনাটি গ্রামের মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পাড়ার পর মঙ্গলবার তিনিও শুনেছেন শিশুটি ধর্ষণের শিকার হয়েছে। কিন্তু পরিবারটি অসহায়-দরিদ্র হওয়ায় শুরুতে থানায় যেতে ভয় পাচ্ছিল।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে রাখালগাছি ইউপি চেয়ারম্যান মহিদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ধর্ষণের ঘটনার একটি অভিযোগ নিয়ে তাঁর কাছে শিশুটির মা এসেছিলেন। তিনি থানা-পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছেন। নিজে পরীক্ষা বা অভিযুক্তকে জরিমানা করার কথা তিনি অস্বীকার করেন। এসব কিছুই তিনি করেননি বলে জানান।