আমরা হেরেছি কারণ গোল হজম করেছিঃ রোনালদো

নিঃসন্দেহে ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। ৯০ মিনিটের এই খেলায় খেলোয়াড় এবং দর্শকদের মধ্যে বেশ উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। আর খেলা মানেই রেকর্ড ভাঙ্গার প্রতিযোগিতা। একজন খেলোয়াড়ের রেকর্ড আরেক খেলোয়াড় ভেঙ্গে দিয়ে নতুন রেকর্ড গড়বে, সৃষ্টি করবে নতুন এক ইতিহাস। নতুন খবর হচ্ছে, ১৯৯৮ বিশ্বকাপ ফাইনালে ব্রাজিলের কী হয়েছিল? রোনালদোর কী হয়েছিল?

শুধু ব্রাজিল–সমর্থক নয়, ফুটবলপ্রেমীদেরও প্রশ্ন দুটো এখনো তাড়িয়ে বেড়ায়। গোটা টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত খেলা ব্রাজিল ফাইনালে ফ্রান্সের কাছে ৩-০ গোলে হেরেছিল। হার-জিত তো খেলারই অংশ, কিন্তু ফাইনালে ব্রাজিল দল যেভাবে খেলেছিল এবং রোনালদোর রহস্যজনক অসুস্থতা এখনো ভ্রুকুটি জাগায় সমর্থকদের। আসলে ঠিক কী ঘটেছিল?

সংবাদকর্মীরা এই প্রশ্ন বহুবার করেছেন ব্রাজিলের সাবেক ফরোয়ার্ড রোনালদোকে। ত্যক্তবিরক্ত হয়ে ২০০০ সালে রোনালদো একবার বলেছিলেন, ‘আমরা হেরেছি কারণ, তিন গোল হজম করেছি।’ স্কোরলাইনের এ হিসাব তো সবাই জানেন। কিন্তু সেই হিসাবের ভেতরে পর্দার আড়ালে কিছু একটা যে ঘটেছিল, তা নিয়ে গুঞ্জন চলে এখনো।

ফাইনালে উঠে আসার আগপর্যন্ত ৬ ম্যাচে ১৪ গোল করেছিল ব্রাজিল। শুধু গোলের হিসাবে নয়, কাফু, রবার্তো কার্লোস, লিওনার্দো, বেবেতো, এদমুন্দো, ক্লদিও তাফারেল, দেনিলসন, রিভালদো, রোনালদোদের ‘তারার হাট’ নিয়ে বিশ্বসেরা ব্রাজিল টুর্নামেন্টের প্রায় সব ম্যাচেই উপহার দিয়েছিল ‘জোগো বনিতো’—সুন্দর ফুটবল। অথচ বিশ্বসেরা দল এবং বিশ্বসেরা ফুটবলার নিয়েও ব্রাজিল কিনা ফাইনালে স্বাগতিক ফ্রান্সের কাছে স্রেফ উড়ে গেল!

ফাইনালে জোড়া গোল করা জিনেদিন জিদান সে ফাইনালের আগে বিশ্বজুড়ে সেভাবে তারকা ইমেজ পাননি। বিশ্বকাপের এক বছর আগে ইতালি, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও ব্রাজিলকে নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে (আসলে বিশ্বকাপের প্রস্তুতি) তৃতীয় হয়েছিলেন জিদানরা। স্বয়ং ফরাসিরাই তখন জাতীয় দলকে দুয়ো দিয়েছে।

ওদিকে ২২ বছর বয়সী রোনালদো বিশ্বকাপের আগেই দুবার ভেঙেছেন বিশ্বের সবচেয়ে দামি ফুটবলারের রেকর্ড। কিন্তু ফাইনালের আগের রাতে রহস্যজনক কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন রোনালদো, এমন খবরই শোনা যায়। ফাইনালে খেললেও মাঠে ছিলেন তাঁর ছায়া হয়ে। তাই প্রশ্নটা এখনো ওঠে, কী হয়েছিল ব্রাজিলের, কী হয়েছিল রোনালদোর?

ফুটবল লেখক করণ তেজওয়ানি সে প্রশ্নেরই জবাব খোঁজার চেষ্টা করেছেন। ‘গার্ডিয়ান’ ও ‘দিজ ফুটবল টাইমস’-এ নিয়মিত লেখা তেজওয়ানির ফুটবলে এনার্জি ড্রিংক নিয়ে ‘উইংস অব চেঞ্জ’ বইও প্রশংসা কুড়িয়েছে। তেজওয়ানি ’৯৮ বিশ্বকাপ ফাইনালে ব্রাজিলের সেই হার এবং রোনালদোর রহস্যজনক পারফরম্যান্সের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন এক নিবন্ধে।

দিদিয়ের দেশম, লঁরা ব্লা (ফাইনালে নিষিদ্ধ হয়েছিলেন), ইউরি দিওরকায়েফ, থিয়েরি অঁরি, জিদান, ফাবিয়েন বার্থেজ, এমানুয়েল পেতিতদের নিয়ে ফ্রান্সের দলটা যথেষ্ট ভারসাম্যপূর্ণ ছিল। ব্রাজিল অন্য পাশে ছিল ইতিহাস গড়ার সন্ধিক্ষণে। ইতিহাসের প্রথম দল হিসেবে টানা দুবার (১৯৫৮, ১৯৬২ এরপর ১৯৯৪) বিশ্বকাপ শিরোপা ধরে রাখার পথে ছিল মারিও জাগালোর দল। ফাইনালের আগে রোনালদো ৪ গোল করে ’৯৮ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের হয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতা। আর বড় মঞ্চেও তত দিনে তিনি ব্রাজিলের ভরসা। ’৯৮ বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে ক্লাব ও দেশের জার্সি মিলিয়ে চার ফাইনালে চার গোল করেছিলেন।

সে যা–ই হোক, ফিফার কাছে ব্রাজিল কোচের দেওয়া অফিশিয়াল একাদশের তালিকা ছিল এমন—গোলকিপার: তাফারেল, ডিফেন্স: কাফু, আলদাইর, জুনিয়র, রবার্তো কার্লোস। মিডফিল্ড: সিজার সাম্পাই, দুঙ্গা, রিভালদো ও লিওনার্দো, ফরোয়ার্ড: বেবেতো ও এদমুন্দো। এদমুন্দো? রোনালদো নেই! তিরিক্ষি মেজাজের কারণে ‘অ্যানিমেল’খ্যাত স্ট্রাইকার এদমুন্দো খেলবেন বিশ্বকাপ ফাইনালে। অথচ গোটা বিশ্বকাপে ব্রাজিলের সর্বোচ্চ গোলদাতা রোনালদো নেই!

তোলপাড় সৃষ্টি হতে সময় লাগেনি। ব্রাজিলের এই একাদশে ধাক্কা খেয়েছিল ফুটবল–বিশ্ব। করণ তেজওয়ানির ভাষায়, ‘যেকোনো খেলায় অন্যতম বড় ধাক্কা লাগার মতো ঘটনাগুলোর একটি, সেটাও খেলা শুরুর আগেই।’ পরে খবর বেরোয়, রোনালদো একাদশের হয়েই মাঠে নামবেন। ভুলে তাঁর নামটা বাদ পড়ে গেছে। এরপর ১২ জুলাই ১৯৯৮, খেলা শুরু হলো। ব্রাজিল হারল। আসলে খেলা শুরুর আগেই তারা হেরে বসেছিল, অন্তত শরীরী ভাষায় সেটাই ফুটে উঠেছিল। কেন?

ঘটনাটিকে দুটি ভাগে ভাগ করেছেন করণ তেজওয়ানি। ১. ফাইনালের আগের পরিস্থিতি। ২. ফাইনাল চলাকালের পরিস্থিতি। দ্বিতীয়টি নিয়ে তেজওয়ানির ব্যাখ্যাটা সহজ—ব্রাজিলের প্রথম ম্যাচে স্কটল্যান্ড যেভাবে রক্ষণ সাজিয়েছিল, ফ্রান্স কোচ আইমে জ্যাকে সেভাবে রক্ষণনির্ভর দল সাজান।

ব্রাজিল সেট পিসে দুর্বল ছিল আর কর্নার থেকে জিদান যে দুটি গোল করেছিলেন, দুটিতেই ‘আনমার্কড’ ছিলেন। ফ্রান্সের সেই জয় আরও বেশি বাহবা পেত, যদি রোনালদোকে নিয়ে রহস্য সৃষ্টি না হতো; শুরু হলো ময়নাতদন্ত। ফাইনালের আগে দুপুরবেলা খাওয়ার সময় কী ঘটেছিল?

বিশ্রামের আগে রোনালদো তাঁর সতীর্থদের সঙ্গে হোটেলে দুপুরের খাবার খান। রোনালদো ও রবার্তো কার্লোস হোটেলে একই কক্ষে ছিলেন। রবার্তো কার্লোসই প্রথম রোনালদোকে অজ্ঞান হিসেবে আবিষ্কার করেন। কিছুটা ভীত হয়ে তিনি অন্য সব সতীর্থকে ডাক দেন। এদমুন্দো, সিজার সাম্পাইরা ছুটে আসেন। কোচ জাগালো তখনো এ নিয়ে কিছু জানতেন না আর সেই কক্ষে তখন নরক গুলজার পরিস্থিতি—নিবন্ধে লেখেন করণ তেজওয়ানি।

বিকেল পাঁচটার দিকে রোনালদোকে লিঁলাস ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হয়। ব্রাজিল দল যে হোটেলে ছিল, সেখানকার ম্যানেজার পল শ্যাভেলে অবাক করা এক তথ্য দেন। ফাইনাল খেলতে স্তাদে দি ফ্রান্সে ব্রাজিল দল যাওয়ার আগের পরিস্থিতি নিয়ে তিনি জানান, ‘ব্রাজিল দল সাধারণত কোনো ম্যাচ খেলতে যাওয়ার আগে হোটেল থেকে বেরোনোর সময় পার্টির আমেজে থাকে।

কেউ গান গাইছে কিংবা গান শুনছে…। কিন্তু সেদিন (ফাইনাল) ছিল এর উল্টো—পিনপতন নীরবতা সবার মধ্যে, এমনকি বাসেও। খেলোয়াড়দের আমরা যারা ব্যক্তিগতভাবে চিনতাম, তখনই বুঝে যাই ব্রাজিল হেরে গেছে। পৃষ্ঠপোষক নাইকির চাপে সেদিন আনফিট রোনালদোকে খেলাতে বাধ্য হয়েছিল ব্রাজি