মহাসড়কে রূপের পসরা সাজিয়েছে জারুল ফুল!

গ্রীষ্মের খরতাপের রেশ কাটিয়ে বর্ষার ভরা মৌসুমেও যেন তাপদাহের এতোটা কমতি নেই। তারপরও প্রকৃতির মাঝে নানান ফুলের রূপ-রস মনে বইয়ে দেয় এক প্রশান্তির সুবাতাস। পিচঢালা প্রাণহীন ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন মহাসড়কের বুক চিরে যেন রূপের পসরা সাজিয়ে বসেছে সবুজ প্রকৃতি। সড়ক বিভাজনের ওই স্থানটিতে নানা প্রজাতির ফুলগাছে ফুটেছে রঙিন ফুল। বর্ষার ভরা মৌসুমে বৃষ্টি স্নানে সিক্ত তরুলতায় যেন প্রাণ ফিরেছে।

এরই মাঝে বনজ জারুল বৃক্ষে গ্রীষ্মে ফোটা অসম্ভব সুন্দর বেগুনি রঙের মায়াভরা থোকা থোকা জারুল ফুল তপ্ত দুপুরে মগ ডালে বসে আকাশের সাথে যেন গড়েছে ভাললাগার সখ্যতা। করোনার এই ধারাবাহিক লকডাউনে মহাসড়কে যানবাহন চলছিল সীমিত। এই সুযোগে ছয় পাঁপড়ির মাঝে হলুদ রংয়ের পরাগ বিশিষ্ট মায়াবী জারুল ফুলের ছোঁয়ায় প্রকৃতি সেজেছে তার আপন মহিমায়। পিচঢালা কালো মহাসড়কের মাঝে সবুজে মন মাতানো তপ্ত এক উদাসী দুপুরেও জারুল ফুলের আভায় সড়কে লেগেছে নৈস্বর্গিক ছোঁয়া।

মহাসড়কের কুমিল্লা অংশে নানা প্রান্তে জারুলের জয়জয়কার। মহাসড়কের মাঝে জারুলের নয়নাভিরাম দৃষ্টি নন্দন রঙ ও রূপ যেন বুলিয়ে দিচ্ছে ভালবাসার পরশ। যানবাহনের যাতায়াতে বাতাসের দোলায় মন ভরিয়ে দিচ্ছে চালক, যাত্রী ও পথচারীদের।

অধিকাংশ জারুল গাছ প্রাকৃতিক ভাবেই বেড়ে উঠে। তবে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে রূপান্তরের পাশাপাশি সড়ক বিভাজনের মাঝে ফলজ, বনজ, ওষুধি গাছের পাশাপাশি রোপণ করা হয়েছে নানা প্রজাতির ফুলগাছ। কিন্তু সৌন্দর্য বিলাতে ফুল গাছের চেয়ে পিছিয়ে নেই জারুলও। ওই বনজ গাছে ফোটা ফুলের শোভায় মহাসড়কে যোগ হয়েছে নয়নাভিরাম সৌন্দর্য্য।

মহাসড়কের কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার মাধাইয়া বাস স্টেশন থেকে কুটুম্বপুর পর্যন্ত প্রায় ৩ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে শতশত জারুল গাছে ফুটে আছে রাশি রাশি ফুল। প্রাইভেট পরিবহনের যাত্রী থেকে শুরু করে পথচারীরা জারুলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে আচমকা থমকে দাঁড়াতে দেখা গেছে। শত ব্যস্ততার মাঝেও জারুল ফুলের সাথে ফ্রেম বন্দি কিংবা খানিক সময় কাটিয়ে সুখানুভূতি প্রাপ্তির যেন তাদের অসামান্য প্রয়াস।

বিভিন্ন তথ্য সূত্রে জানা যায়, জারুলের ইংরেজী নাম প্রাইড অব ইন্ডিয়া এবং বৈজ্ঞানিক নাম লেজারস্ট্রমিয়া স্পেসিওজা। বৈজ্ঞানিক নামটির প্রথম অংশ এসেছে সুইডেনের অন্যতম তরু অনুরাগী লেটারস্ট্রমের নাম থেকে। শেষাংষটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ স্পেসিওজা। যার বাংলা সুন্দর।

জারুল ভারতীয় উপমহাদেশের নিজস্ব বৃক্ষ। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, নেপাল, ভুটান, চীন মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে জারুলের সন্ধান মেলে। এই পাতা ঝড়া বৃক্ষ শীতকালে পত্র শূন্য থাকে। বসন্তে নতুন গাঢ় সবুজ পাতা গজায়। গ্রীষ্মে ফুটে অসম্ভব সুন্দর থোকায় থোকায় ফুল। দূর থেকে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে জারুল। ২০ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে এই জারুল গাছ। রয়েছে তার নানা প্রকার ভেষজগুণও। তারপরও জারুল গাছ রোপণে আগ্রহ নেই অধিকাংশ মানুষের। প্রাকৃতিক ভাবে বাড়ির পাশে জারুল গাছ বেড়ে উঠলে তা রাখতেও চায় না অনেকে। তাই জারুল অবহেলিত বৃক্ষও বটে।

সামাজিক সংগঠন ‘লাল-সবুজ উন্নয়ন সংঘ’ প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি কাওসার আলম সোহেল জানান, ‘বেগুনি রঙের জারুল ফুলের অনন্য শোভা যে কোন মানুষকে বিমোহিত করবে এটাই স্বাভাবিক। জারুল গাছ সকলেই কর্তন করে, কেউ রোপন করে না। তাই আগের মতো আর চোখে পড়ে না। অথচ এই জরুল ফুল আবহমান বাংলার এক অপরূপ সাজের মনিহার ছিলো।

তিনি আরো বলেন, অনেকের কাছে গাছটি অবহেলিত হলেও আমরা এই জারুল গাছ সংরক্ষণে লাল সবুজ উন্নয়ন সংঘ ৬৪ জেলায় জারুল চারা রোপণ করছি। এবছরও জারুল গাছের চারা রোপণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংগঠনটি। সৌন্দর্য্য বর্ধন ও জারুল গাছ সংরক্ষণে সবাইকে এগিয়ে আসতে বলেন তিনি।

এ ব্যাপারে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মেহেরুন নেছা জানান- জারুলকে ‘বাংলার চেরি’ বলা হয়। গাঢ় সবুজ পাতার উপরে বেগুনি রঙয়ের পাঁপড়িতে ফোটা জারুল ফুল গ্রীষ্ম থেকে শরৎ পর্যন্ত থাকে।

তিনি আরো জানান, জারুলের ভেষজ গুণও রয়েছে। জ্বর, অনিদ্রা, কাশি ও অজীর্ণতায় জারুল খুবই উপকারী। বাতের ব্যাথায় জারুল গাছের পাতা বেটে প্রলেপ দেয়া হয়। শিকড় সিদ্ধ করা পানি মধুর সঙ্গে মিশিয়ে খেলে কাশি ভালো হয়। ডায়বেটিস রোগেও এর বীজ, ছাল ও পাতা ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তাই প্রকৃতিকে সুন্দর ভাবে সাজাতে এবং ভেষজ ওষুধ হিসেবে জারুল গাছ রোপন করা প্রয়োজন।