আইআইইউসি ছাত্রকে হ’ত্যার পর বেডশীট, মশারি মুড়িয়ে ফেলা’ হয় হাতিরঝিলে

রাজধানীর হাতিরঝিল লেকের মেরুল-বাড্ডা প্রান্তে অজ্ঞাতনামা এক যুবকের অর্ধগলিত লা’শ উদ্ধার করার সেই হ’ত্যার রহস্য উন্মোচন করেছে পুলিশ। গত ১২ অক্টোবর লা’শটি উদ্ধার করা হয়। আজিজুল ইসলা’ম মেহেদী নামের ওই যুবক চট্টগ্রামের আন্তর্জাতিক ইসলা’ম বিশ্ববিদ্যালয়ের (আইআইইউসি) ছাত্র ছিলেন। তিনি আমেরিকা প্রবাসী বাবার একমাত্র ছেলে।

মেহেদীকে হ’ত্যার বিবরণ ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) আওতাধীন ‘ডিসি তেজগাঁও-ডিএমপি’ ফেসবুক পেজে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস পাঠকদের জন্য লেখাটি তুলে ধরা হলো- ‘গত ১২ অক্টোবর সকাল ৭টার দিকে হাতিরঝিল থানাধীন হাতিরঝিল লেকের মেরুল-বাড্ডা প্রান্তে অজ্ঞাতনামা এক যুবকের অর্ধগলিত লা’শ উদ্ধার করে পুলিশ। তার হাত পা রশি দিয়ে বাধা ছিল। বেডশীট-মশারি ও পলিথিনে মোড়ানো ছিল পুরো শরীর। মুখমন্ডল, হাত, আঙ্গুল ও শরীরের বিভিন্ন স্থান ছিল বিকৃত। যে কারণে ফিংগার প্রিন্ট সংগ্রহের মাধ্যমেও তার পরিচয় সনাক্ত করা যায়নি।

হাতিরঝিল লেকের যে স্থানে এ মৃতদেহটি ভেসে ছিল সেখান থেকে প্রায় ৫০ মিটার উত্তরে লেকের পানি ঘেষে পড়ে থাকা একটি ছেড়া কাগজে লেখা একটি মোবাইল নম্বরের সূত্র ধরে মৃত ব্যক্তির পরিচয় সনাক্তের পাশাপাশি হ’ত্যাকান্ডে জড়িত আ’সা’মীদের গ্রে’ফ’তার করে হাতিরঝিল থানা পুলিশ।

মৃত ব্যক্তির নাম আজিজুল ইসলা’ম মেহেদী। বয়স ২৪ বছর। তিনি আন্তর্জাতিক ইসলা’ম বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের ইংরেজি বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র ছিলেন। আমেরিকা প্রবাসী বাবার একমাত্র ছেলে। আজিজুল ইসলা’ম মেহেদীর জন্ম চট্টগ্রাম জেলা’র সন্দীপের বাউরিয়া গ্রামের হলেও বেশ কয়েক বছর ধরে মাকে নিয়ে চট্টগ্রামের ফিরোজ শাহ এলা’কায় থাকতেন তিনি। লেখাপড়া শেষ করে কানাডায় যাওয়ার ইচ্ছে ছিল তার। লেখাপাড়ার পাশাপাশি পরিচিতজনদের পাসপোর্ট ও ভিসা প্রসেসিংয়ে সহায়তা করতেন মেহেদী।

গত ১৩ অক্টোবর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল জোনের এডিসি হাফিজ আল ফারুকের নেতৃত্বে এসি আশিক হাসান, হাতিরঝিল থানার ওসি আব্দুর রশীদ, ইন্সপেক্টর মহিউদ্দিন, এসআই আতাউল ও এএসআই তরিকুল ইসলা’মের একটি টীম রাত ১টা ২০মিনিট থেকে ভোর ৬টা ৪০ পর্যন্ত খিলক্ষেত থানাধীন উত্তরপাড়া এলা’কা থেকে এ হ’ত্যাকাণ্ডে জড়িত আ’সা’মী আহসান ও তামিম, হাতিরঝিল থানাধীন মহানগর আবাসিক এলা’কা থেকে আলা’উদ্দিন এবং রামপুরা এলা’কা থেকে রহিমকে গ্রে’ফ’তার করে।

গ্রে’ফ’তারকৃত আহসান, আলা’উদ্দিন ও রহিম বিজ্ঞ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। গ্রে’ফ’তারকৃত আহসানের জন্ম চট্টগ্রাম জেলা’র সন্দীপের বাউরিয়া গ্রামে। সে নিহত আজিজুল ইসলা’মের বাল্যবন্ধু। পাঁচ বছর মালেশিয়ায় থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে বাংলা’দেশে ফেরে আহসান। চলতি বছরের মার্চে গুলশান-২ এ অবস্থিত ‘দ্য গ্রোভ’ রেস্টুরেন্টে মাসিক ৬৫ হাজার টাকা বেতনে এক্সিকিউটিভ শেফ হিসেবে যোগদার করে। তবে করোনায় রেস্টুরেন্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আর্থিক সংকটে পড়ে আহসান। তখন সে তার স্ত্রীর আত্মীয় এ হ’ত্যাকাণ্ডে জড়িত অপর আ’সা’মী আলা’উদ্দিনের কাছে কিছু টাকা ধার চায়।

আলা’উদ্দিন পেশায় ড্রাইভার হলেও পাসপোর্ট অফিসে দালা’লী ও পরিবহন পুলের পুরাতন গাড়ি ক্রয়-বিক্রয়ের সাথে জড়িত ছিল। আলা’উদ্দিন আহসানকে টাকা ধার না দিয়ে পাসপোর্ট সংক্রান্ত কাজ (নামের বানান সংশোধন, জন্ম তারিখ সংশোধন, বয়স বাড়ানো কমানো) দিতে বলে। এ কাজে যে টাকা পাওয়া যাবে দুজনে ভাগ করে নেবে।

আহসান বাল্যবন্ধু আজিজুল ইসলা’ম মেহেদীকে জানায়, পাসপোর্টে সমস্যা সংক্রান্ত কোন কাজ থাকলে সে সমাধান করে দিতে পারবে।চট্টগ্রামের তিনটি পাসপোর্টের নাম ও বয়স সংশোধনের জন্য গত ১২ আগস্ট ঢাকায় আহসানের কাছে আসে মেহেদী। আলা’উদ্দিনকে বিষয়টি জানালে তার গাড়িতে আহসান ও মেহেদীকে মহানগর আবাসিক এলা’কায় অবস্থিত তার বাসায় নিয়ে যায়। দুই সপ্তাহের মধ্যে পাসপোর্ট তিনটির নাম ও বয়স সংশোধন করে দেওয়ার বিনিময়ে আলা’উদ্দিনকে এক লা’খ ৮০ হাজার টাকা ও আহসানকে এক লা’খ টাকা দেয় মেহেদী।

আগারগাও পাসপোর্ট অফিসে কর্মরত উচ্চমান সহকারী পদমর্যাদার এক ব্যক্তিকে আর্থিক সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে পাসপোর্টে নাম ও বয়স সংশোধনের কাজ করতো আলা’উদ্দিন। পাসপোর্ট তিনটি সংশোধনের জন্য পাসপোর্ট অফিসের সেই ব্যক্তিকে দিলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সে কাজ কতে দিতে পারেনি। মেহেদী আহসান ও আলা’উদ্দিনকে এজন্য চাপ দেয়। পরবর্তীতে আহসান ও আলা’উদ্দিন মেহেদীর কাছে এক সপ্তাহ সময় চেয়ে নেয়। এই সময়েও পাসপোর্ট সংশোধনের কাজ করতে ব্যর্থ হওয়ায় আলা’উদ্দিন ও আহসানের কাছে পাসপোর্ট ও টাকা ফেরত চায় মেহেদী।

আহসান ও আলা’উদ্দিন পাসপোর্ট ও টাকা ফেরত না দিয়ে সময় ক্ষেপন করতে থাকে। একপর্যায়ে মেহেদী এ দুজনকে জানায় পাসপোর্ট ও টাকা ফেরত না দিলে ঢাকায় এসে তাদের অফিসে অভিযোগ করবে। চাকরি হারানোর ভয়ে আহসান ও আলা’উদ্দিন মেহেদীকে হ’ত্যা করার পরিকল্পনা করে। এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আহসান ও আলা’উদ্দিন পাসপোর্ট নেওয়ার জন্য মেহেদীকে গত ১০ অক্টোবর ঢাকায় আসতে বলে।

ওইদিন রাত ১১টা ১০ মিনিটে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় এসে পৌছায় মেহেদী। হ’ত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা মোতাবেক আহসান মেহেদীকে খিলক্ষেত উত্তরপাড়ায় অবস্থিত তার ভাড়া বাসায় নিয়ে যায়। খাবারের সাথে ঘুমের ঔষধ খাওয়ানো হয় মেহেদীকে। রাত অনুমান দেড়টার সময় ঘুমন্ত মেহেদীকে শ্বাসরুদ্ধ করে হ’ত্যা করে মেহেদীর হাত, পা রশি দিয়ে শক্ত করে বেধে বেডশীট, মশারি ও পলিথিনে মুড়িয়ে ফেলে মোবাইল ফোনে আলা’উদ্দিনকে হ’ত্যার পর বিষয়টি কনফার্ম করে আহসান।

উল্লেখ্য ৮ অক্টোবর আলা’উদ্দিন পেশাগত কাজে সিলেটে যায়। নিজেকে সন্দেহের বাইরে রাখতে ঢাকার বাইরে অবস্থানের সময়ে মেহেদীকে হ’ত্যার পরিকল্পনা করে আহসানের মাধ্যমে মেহেদীকে ঢাকায় আসতে বলে আলা’উদ্দিন। আহসানের পাশের রুমের ভাড়াটিয়া তামিম (‘দ্য গ্রোভ’ রেষ্টুরেন্টে কর্মরত কলিগ) আকস্মিকভাবে আহসানের রুমে ঢুকে হ’ত্যাকাণ্ডের বিষয়টি জানতে পারে। আহসানের অনুরোধের প্রেক্ষিতে তামিম জানায়, এ বিষয়টি সে কাউকে বলবে না এবং লা’শটি সুবিধাজনক স্থানে ফেলে দিতে আহসানকে সহায়তা করবে।

লা’শ সরিয়ে ফেলা’র জন্য ভোর চারটার দিকে আলা’উদ্দিন খিলক্ষেত উত্তরপাড়ায় আহসানের বাসায় গাড়ি পাঠায়। আহসান ও তামিম ড্রাইভারকে গাড়িতে বসতে বলে নিজেরাই মালা’মাল গাড়িতে তুলবে জানালে ড্রাইভার তাদের মালা’মাল গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়। পাশাপাশি ফজরের নামাজ শেষ হওয়ায় লোক সমাগম বেড়ে যাওয়ায় গাড়ি ছেড়ে দেয় আহসান।

লা’শ বিছানার নিচে রেখে দুপুর বারোটার দিকে ‘দ্য গ্রোভ’ রেষ্টুরেন্টে ডিউটিতে যায় আহসান ও তামিম। কাজ শেষে দুজন একসাথে বাসায় ফেরে। রাত একটার দিকে আলা’উদ্দিনের নির্দেশে ড্রাইভার রহিম আলা’উদ্দিনের নোয়া মাইক্রোবাসটি চালিয়ে লা’শ ফেলে দেওয়ার জন্য খিলক্ষেত উত্তরপাড়ায় আহসানের বাসায় যায়।

আহসান ও তামিম বিছানা, মশারি, বেডশীট ও পলিথিনে মোড়ানো মেহেদীর লা’শটি মাইক্রোবাসে উঠিয়ে ড্রাইভার রহিমকে সায়েদাবাদে যেতে বলে। পথে তামিম নেমে যায়। আহসান মাইক্রোতে লা’শটি নিয়ে হাতিরঝিল এলা’কায় প্রবেশ করে। হাতিরঝিল লেকের মেরুল-বাড্ডা প্রান্তে লোকজনবিহীন ও অন্ধকারচ্ছন্ন দেখে ড্রাইভার রহিম গাড়ি থামিয়ে দরজা খুলে দেয়। আহসান লা’শটি গাড়ি থেকে পানিতে ফেলে দেয়।

গ্রে’ফ’তারকৃত আ’সা’মীদের কাছে তিনটি পাসপোর্ট, চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আ’সা’র জন্য ব্যবহৃত মেহেদীর বাস টিকিট জব্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি যে মাইক্রোবাসটি ব্যবহার করে মেহেদীর লা’শ হাতিরঝিলে ফেলে দেওয়া হয়েছে, সেই মাইক্রোবাসটিও জব্দ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ জানান, ‘এটি একটি ক্লু-লেস হ’ত্যাকাণ্ড। ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমে লা’শের পরিচয় যাতে শনাক্ত করা না যায় সেজন্য হাতের আঙ্গুল বিকৃতকরনের পাশাপাশি মুখমন্ডলও বিকৃত করে খুনিরা। যেখানে লা’শ ফেলেছিল সেখান থেকে ৫০ মিটার দূরে পাওয়া একটি ছেড়া কাগজে লেখা মোবাইল নম্বরের সূত্র ধরে লা’শের পরিচয় শনাক্তকরনের পাশাপাশি হ’ত্যাকাণ্ডে জড়িত চারজন আ’সা’মীকে গ্রে’ফ’তার ও সব আলা’মত উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছি আমরা। পুলিশি তদন্তের উৎকর্ষতার প্রমান এই মামলা’টি।’