যে কারণে বাংলাদেশকে অখুশি করতে চায় না ভারত

পেঁয়াজ কূটনীতির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ব্যাপারে যতই উষ্ণতার বাণী ছড়ানো হোক, আসলে যে সম্পর্কের যে টানাপোড়ন রয়েছে- পেঁয়াজ বন্ধের নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ভারত সেটা বুঝিয়ে দিয়েছে।

কিন্তু পেঁয়াজ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, ভারত যেন নিজের পায়ে নিজেই কুড়োল মেরেছে। এই নিয়ে ভারতের রাজনীতিতে নানামুখী প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে নরেন্দ্র মোদী এই ঘটনায় ব্যাপকভাবে সমালোচিত হচ্ছেন।

উপমহাদেশে ভারতের কোন বন্ধু নেই, নেপালের সঙ্গে এখন বিরোধ, শ্রীলঙ্কা-ভারত বিরোধিতা অনেক প্রবল, মালদ্বীপের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক নাজুক, পাকিস্তানের সম্পর্কের ব্যাপারে তো নতুন করে কিছু বলার নাই। এই অবস্থায় এই অঞ্চলে বাংলাদেশই ছিল একমাত্র ভারতে বন্ধু। সেই বন্ধুর সঙ্গে এই ধরণের ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ ভারতের রাজনীতিতে বিজেপিকে সমালোচিত করছে। ভারতের ‘থিংক ট্যাঙ্ক’ এবং ভারতের বোদ্ধারা বলছে, এর মাশুল দিতে হবে নরেন্দ্র মোদীকে।

নরেন্দ্র মোদী বিষয়টা দেরিতে হলেও বুঝেছেন। এই কারণেই মোদীর হস্তক্ষেপেই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বৈঠকের মাধ্যমে যে সমস্ত পেয়াজগুলো বাংলাদেশে রপ্তানির জন্য এলসি করা হয়েছিল, সেই পেয়াজগুলোকে ছাড় দেয়া হয়েছে।

কিন্তু ছাড় দেয়ার পরও ভারত যে অবিশ্বাসী বন্ধু, ভারত যে নিজের স্বার্থের বাইরে কিছু করেনা- সেটি স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে। ভারতের ‘থিংক ট্যাঙ্করা’ মনে করছেন, এর ফলে বাংলাদেশের জনগণ একটা ভুল বার্তা পেল। বাংলাদেশে ভারত বিরোধী মনোভাব এবং চিন্তা-ভাবনা আরও প্রকট হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হল।

কিন্তু এসবের পরেও বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত বড় ধরণের কোন বিরোধে জড়াতে চায় না, বলেই মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা মনে করেন, বাংলাদেশ ভারতের জন্য অপরিহার্য এবং ভারত এখন বাংলাদেশকে চটাতে চায় না। ভারত এখন বাংলাদেশকে চটাতে চায় না, তার একাধিক কারণ আছে বলে মনে করেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। তার মধ্যে রয়েছে

১। উপমহাদেশে একঘরে হওয়া

ভারত এখন উপমহাদেশে প্রায় একঘরে অবস্থায় আছে। এই সার্ক অঞ্চলে কোন দেশের সাথে তার সুসম্পর্ক নেই। এই কারণেই বাংলাদেশের সাথে সুসম্পর্ক রাখাটা ভারতের জন্য অপরিহার্য। আর এই বাস্তবতায় তারা বাংলাদেশের সাথে এখনো বেশি খারাপ সম্পর্কে যেতে চায় না।

২। সীমান্তে বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা

বাংলাদেশ ২০০৮ থেকে ভারতের সবচেয়ে বেশি যে উপকারটি করেছে, তাহলো বিচ্ছিন্নতাবাদী আশ্রয়-প্রশ্রয় না দেয়া। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুস্পষ্ট নীতি হল যে, বাংলাদেশের মাটি কোন দিন বিচ্ছিন্নতাবাদীদের জন্য ঘাঁটি হবে না। আর এটি তিনি শুধু মুখেই বলেননি, বাস্তবে প্রমাণ করেছেন।

বাংলাদেশে থেকে যত বিচ্ছিন্নতাবাদীদের তৎপরতা হতো, অতীতে সেগুলো সমূলে উৎপাটন করা হয়েছে। আর ভারত খুব ভালোমতোই জানে যে, বাংলাদেশে শেখ হাসিনা বাদ দিয়ে অন্য কোন সরকার এলে এই বিচ্ছিন্নতাবাদীরা আবার লালিত-পালিত হবে। আবার তারা বাংলাদেশের মাটি ভারত বিরোধিতার কাজে ব্যবহার করতে পারে। আর এই কারণেই তারা মনে করছে, শেখ হাসিনার কোন বিকল্প নেই। এ জন্যই বাংলাদেশকে এখন তারা অখুশি করতে চায় না।

৩। বাংলাদেশের বাজার

ভারত জানে যে, বাংলাদেশে একটি বড় বাজার আছে। এই বাজার ক্রমশ বিকশিত হচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের কারণে মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বাড়ছে। ফলে বাংলাদেশের বাজার যদি ধরতে চায়, তাহলে বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্কের কোন বিকল্প নাই। ইতোমধ্যে সার্ক অঞ্চলের অনেক দেশেই ভারতের বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

কাজেই বাংলাদেশের সঙ্গে পেঁয়াজ নিয়ে এই ধরণের অনঅভিপ্রেত ঘটনায় জড়িয়ে পড়লে, বাংলাদেশকে সবসময় বিকল্প চিন্তা করতে হবে। এই বিকল্প চিন্তার মাধ্যমে বাংলাদেশ নতুন বাজার সন্ধান করবে। যে সমস্ত পণ্য-সামগ্রীর ব্যাপারে বাংলাদেশ ভারতের উপর নির্ভরশীল, সে সমস্ত পণ্য বিকল্প উৎস থেকে আহরণের চেষ্টা করবে। আর এটা করতে গেলে, শেষ বিচারে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ভারতই।

আর এ সমস্ত বিবেচনায় ভারত এখনই বাংলাদেশকে অখুশি করতে চায় না। ভারত জানে যে, বাংলাদেশ যদি অখুশি হয় বা বাংলাদেশকে যদি চাপে ফেলা হয়। তাহলে পরে সবচেয়ে অসন্তুষ্ট হবে বাংলাদেশের জনগণ। বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব সবসময় বিদ্যমান থাকে। সেটি যদি আরও বড় হয় এবং ঘনীভূত হয় তবে শেষ বিচারে ক্ষতি হবে ভারতেরই।