সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফিরলে আদর করে বাবা-মা, আজ তাদের খুঁজছে আফরা

কা’ন্না আর আহাজারি করা খালা-নানিদের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল শি’শুটি। বয়স মাত্র সাড়ে তিন বছর। কয়েক ঘণ্টা আগে বাসের চাপায় পৃথিবী ছেড়ে গেছেন তার মা-বাবা। কী’’’ হয়েছে তখনো বুঝতে পারেনি তাদের একমাত্র মে’য়ে আফরা আজুস। শি’শুটির খালা রেশমি আক্তার বলছিলেন, ‘আফরা ওর বাবা-মাকে খুঁজছে। সন্ধ্যা হলে ও বাবা-মায়ের জন্য কা’ন্নাকাটি করবে। তখন কী’’’ জবাব দেব ওরে। প্রতিদিন সন্ধ্যায় বাবা-মা অফিস থেকে ফিরলে আদর পায় ও। আজ কী’’’ হবে!’ বলেই কা’ন্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

গতকাল সোমবার দুপুরে দক্ষিণখানের পূর্ব মোল্লারটেকে আফরাদের বাসায় গেলে দেখা যায় শোকগ্রস্ত স্বজন ও প্রতিবেশীদের ভিড়। স্বজনরা বুক চাপড়ে আহাজারি করতে করতে বলছিলেন, তরতা’জা দুটি প্রা’ণ এভাবে কেড়ে নিল ওরা; ওরা কি মানুষ, না পশু। ওদের কি বিচার হবে না? কেউ বলছিলেন, এখন এই মাসুম বাচ্চাটাকে কে দেখবে? শি’শুটির নানি ফিরোজা বেগম বলছিলেন, ‘প্রতিদিন সকালে আমা’র মে’য়ে-জামাই বাচ্চাটাকে আমা’র কাছে রেখে অফিসে যায়। এরপর সন্ধ্যায় তারা একসঙ্গে অফিস থেকে ফিরেই সন্তানকে বুকে টেনে নেয়। বাচ্চাটাও অ’পেক্ষায় থাকে, কখন বাবা-মা অফিস থেকে ফিরে এসে তাকে আদর করবে। আমা’র এত ভালো মে’য়ে-জামাইরে মাই’রা ফা’লাইলো, এহন আমা’র নাতিডারে কে আদর করবে গো, সন্ধ্যা হইলে নাতিরে কী’’’ জবাব দিব গো। কে আমা’রে মা বলে ডাকবে…?’

পু’লিশ ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একমাত্র কন্যাসন্তান নিয়ে পূর্ব মোল্লারটেক তেঁতুলতলা এলাকার বাসায় থাকতেন আকাশ ইকবাল (২৭) ও তাঁর স্ত্রী’’’ মায়া হাজারিকা মিতু (২৫)। সেখান থেকে প্রতিদিনের মতো মোটরসাইকেলে করে গতকাল সকালে গুলশানে কর্মস্থলের দিকে যাচ্ছিলেন তাঁরা। বিমানবন্দর সড়কের পদ্মা অয়েল গেটের পাশে পেছন থেকে এসে আজমেরী পরিবহনের একটি বাস চাপা দিলে ঘটনাস্থলেই তাঁদের মৃ’ত্যু হয়।

বিমানবন্দর থা’নার ওসি বি এম ফরমান আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, সকাল ৭টার দিকে এই দুর্ঘ’টনা ঘটে বলে প্রাথমিক ত’দন্তে জানা গেছে। মোটরসাইকেল আরাহী ওই দম্পতিকে পেছন থেকে প্রথমে ধাক্কা দেয় বাসটি। এতে তাঁরা সড়কে ছিট’কে পড়ে যান। তখন বাসটির চাকায় পিষ্ট হয়ে তাঁরা মা’রাত্মক আ’হত হন। স্থানীয়দের সহযোগিতায় তাঁদের উ’দ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতা’লে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃ’ত ঘোষণা করেন। দুজনের লা’শ ময়নাত’দন্তের জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতা’লের ম’র্গে পাঠানো হয়। এই ঘটনায় নি’হত মিতুর বাবা মানিক মিয়া বাদী হয়ে বাসের চালক ও হেলপারকে আ’সামি করে একটি মা’মলা করেছেন।

গতকাল দুপুরে ঘটনাস্থলে গিয়ে আশপাশের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাসটি পেছন থেকে মোটরসাইকেলটিকে ধাক্কা দিলে আরোহীরা পড়ে যান। এরপর ওই বাসের সামনের চাকা তাঁদের শরীরের ওপর দিয়ে চলে যায়। লোকজন জানায়, এই সড়কে প্রায়ই দুর্ঘ’টনায় অনেক মানুষ মা’রা যাচ্ছে। গাড়ি ‘উড়াল’ গতিতে চলে জানিয়ে রজব নামের একজন বলেন, এই সড়কে কত কিলোমিটার গতিতে গাড়ি চলা উচিত আর কত কিলোমিটার গতিতে গাড়ি চলে, তা দেখার কেউ নেই। বিশেষ করে বাস বেপরোয়াভাবে পাল্লা দিয়ে চলে। আবার রাতে সড়কে ঠিকমতো বাতি জ্বলে না। ঘটনার সময় সকালে সড়কের ওই এলাকায় কোনো ট্রাফিক পু’লিশ ছিল না বলেও আশপাশের লোকজন জানায়।

স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নি’হত আকাশ একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। আর স্ত্রী’’’ মিতু চাকরি করেন একটি হোটেলে। বাসে অফিসে যেতে দেরি হওয়ায় আকাশ কিছুদিন আগে মোটরসাইকেলটি কেনেন। তাঁদের দুজনের কর্মস্থলই গুলশান এলাকায়।নি’হত মিতুর বাবা মানিক মিয়া বলেন, আকাশের গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরে। মে’য়ে-জামাই তাঁর বাড়ির পাশে ভাড়া বাসায় থাকতেন। প্রতিদিন মোটরসাইকেলে তাঁরা একসঙ্গে অফিসে যেতেন। কিন্তু আজ এ কী’’’ হলো। নিজেকে কিছুটা সামলে বলেন, ‘যে বাসচালক আমা’র মে’য়ে ও জামাইকে হ’ত্যা করেছে, তার বিচার চাই। এভাবে আর যেন কোনো মা-বাবার বুক খালি না হয়।’

আকাশের ফুপাতো ভাই মো. মিজানুর রহমান মিন্টু জানান, ফরিদপুর সদর উপজে’লার ধুলদি গ্রামের শেখ জাফর ইকবালের ছে’লে আকাশ। উত্তরায় একটি ডেভেলপার কম্পানিতে আকাশ, আর বিমানবন্দরে হোটেল লেক ক্যাসেল রেস্টুরেন্টে চাকরি করতেন মিতু।স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘদিন প্রে’মের স’ম্পর্কের পর পারিবারিকভাবে আকাশ ও মিতুর বিয়ে হয়। তাঁরা ছিলেন সুখী দম্পতি। এলাকায় তাঁদের অনেক সুনাম রয়েছে। প্রতিবেশী ও স্বজনদের সঙ্গে ভালো স’ম্পর্ক ছিল।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ম’র্গে ময়নাত’দন্ত শেষে গতকাল সন্ধ্যা ৬টার দিকে আকাশ ও মিতুর ম’রদেহ নেওয়া হয় মোল্লারটেকে বাসার সামনে। সেখানে স্বজনদের কা’ন্নায় পরিবেশ ভা’রী হয়ে ওঠে। দক্ষিণখানের মোল্লারটেকে আকাশ ও মিতুর প্রথম জানাজা শেষে লা’শ গ্রামের বাড়ি ফরিদপুর নিয়ে যাওয়া হয়েছে। স্বজনরা জানায়, তিন বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে মিতু ছিলেন সবার বড়। আকাশের বাড়ি ফরিদপুর শহরের নিখুদ্দি এলাকায়। তাঁর মা-বাবা গ্রামে থাকেন। তিনি এক বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে মেজো ছিলেন। পরিবারের লোকজন জানায়, গত শনিবার আনজুম আফরাকে তার মা-বাবা স্থানীয় আব্দুল খালেক মডেল স্কুলে প্লে শ্রেণিতে ভর্তি করান।

ঘটনাস্থল পরিদর্শনকারী বিমানবন্দর থা’নার এসআই মশিউল আলম বলেন, বাসটি আ’ট’ক করা গেলেও চালক-হেলপার পালিয়ে যায়। তাদের ধরতে অ’ভিযান চলছে।চুয়াডাঙ্গায় স্বামী-স্ত্রী’’’ নি’হত : কালের কণ্ঠ’র চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি জানান, গতকাল সন্ধ্যায় সদর উপজে’লার হাতিকা’টা মোড়ে আলমসাধুর (ভটভটি) সঙ্গে মুখোমুখি সং’ঘর্ষে মোটরসাইকেল আরোহী স্বামী-স্ত্রী’’’ নি’হত হয়েছেন। তাঁরা হলেন আবদুল্লাহ আল মাসুম (৩২) ও স্ত্রী’’’ লিভা খাতুন (২৫)। তাঁরা জে’লা শহরের শান্তিপাড়ার বাসিন্দা ছিলেন।

চুয়াডাঙ্গা সদর থা’নার ওসি আবু জিহাদ খান জানান, শান্তিপাড়ার বাড়ি থেকে মোটরসাইকেলযোগে মেহেরপুর জে’লার পিরোজপুর গ্রামের বাড়ি যাচ্ছিলেন মাসুম ও তাঁর স্ত্রী’’’ লিভা। তাঁরা হাতিকা’টা মোড়ে পৌঁছলে বিপরীত দিক থেকে আসা ইটবোঝাই একটি আলমসাধুর সঙ্গে মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সং’ঘর্ষ হয়। স্বামী-স্ত্রী’’’ দুজনকে উ’দ্ধার করে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতা’লে নিলে সন্ধ্যা ৭টার দিকে চিকিৎসকরা মাসুমকে মৃ’ত ঘোষণা করেন। গুরুতর আ’হত লিভা খাতুনকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতা’লে নেওয়ার পথে আলমডাঙ্গায় তাঁরও মৃ’ত্যু হয়।