শীতে ফযরের আযান দেওয়া হয় শুয়ে শুয়ে ! সুদের টাকা দেওয়া হত ইমামের বেতন

মুয়াজ্জিনের আহ্বানে আমরা কল্যাণের পথে প্রভুর দরবারে হাজিরা দিই। কেমন আছেন আমাদের যারা ডেকে আনেন মসজিদে। আজ তাদের সম্পর্কে কিছু জানাব। গোলাম মোক্তাদির চৌধুরী ইমাম পদে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। ইমামের দায়িত্ব

বেশ কিছুদিন পালন করে এখন অনীহা প্রকাশ করছেন। কেন এ অনীহা জানতে চাওয়া হলে করুণ কণ্ঠে বলেন, মসজিদ উন্নত হয়েছে। মার্বেল পাথর বসানো হয়েছে। এসি বাতাস বইছে সবসময়। অজুর স্থান ও টয়লেট বিশেষ রকমের টাইলসযুক্ত। কিন্তু আমার বাসস্থানের ব্যবস্থা সুন্দর করেনি মসজিদ কমিটি। মসজিদের আয়তন বৃদ্ধি পেয়েছে।

মসজিদ সেবকদের পরিবারের জন্য কোনো বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হয়নি। মসজিদ কমিটি বিভিন্ন হুকুম প্রদান করে ইমামদের। নামাজের ব্যাপারে ছোট সূরা নির্দিষ্ট করে দেয় কমিটি। বুড়া হয়ে গিয়েছি। পা ব্যথা। রুকুতে কম সময় নেবেন। কমিটির অযৌক্তিক বিভিন্ন শর্ত মেনে চলতে হয় ইমামদের। অপ্রিয় হলেও সত্য যে, প্রায় সব মসজিদের খতিব, ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমরা সেবা করে যাচ্ছেন অল্প বেতনে। গার্মেন্ট, হোটেল বয়দের চেয়ে কম

বেতন পাচ্ছেন তারা। নির্দিষ্ট বেতন কাঠামো থাকা সত্ত্বেও কার্যকর হচ্ছে না সে বেতন। এ কথা বলেন, ঢাকা শহরের নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এক খতিব, তিনি বলেন, আজ খতিবরাও রয়েছেন বিভিন্ন সমস্যায়। জুমার খুতবার বিষয় কমিটি থেকে অনুমোদন নিয়ে নির্ধারণ করতে হয়। সুদ, ঘুষ, ব্যভিচার সমাজে যেসব ঘটনা ঘটছে তা কীভাবে আলোচনা করব তা ভাবতে হয়।

পরহেজগার ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে টাকার জন্য মসজিদ কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে রাখা হচ্ছে এলাকার মাতবরদের। সুদের টাকা দিয়ে হজ করে এসে হচ্ছেন কমিটির সভাপতি। ছেলে প্রবাসী, প্রচুর টাকার মালিক। মসজিদ উন্নয়নের জন্য তাকেই করা হচ্ছে প্রধান। তারা সত্য আলোচনা করতে নিষেধ করে দিচ্ছেন। মসজিদের পাশাপাশি অন্য ব্যবসা করা, মাহফিলে যাওয়াকে তারা বিরক্ত চোখে দেখেন। হুজুর মানুষের এত টাকা কেন দরকার। আল্লাহর নবীরা কত কষ্ট করেছিল। হুজুরের এত আরামের প্রয়োজন

কেন ইত্যাদি বলছে। মুখ বুজে কমিটির গোলামি করে যাচ্ছি। হতাশ হয়ে বললেন এক খতিব। অল্প বেতনে আজান দিয়ে যাচ্ছেন এক মুয়াজ্জিন। তিনি বলেন, আজান সামান্য দেরিতে হলে ছুটির প্রয়োজন হলে খেতে হয় হুমকি। আমি খুব গরিব মুয়াজ্জিন। যে টাকা পাই তা দিয়ে ডাল ভাত খেয়ে মোটামুটি আছি। এসব কথা লিখে আমার সর্বনাশ করবেন না। আয়তনে মসজিদ বাড়ে, খাদেমের সংখ্যা বাড়ে না। অনেক ইমাম ও মুয়াজ্জিনকে খাদেমের কাজ করতে হয়। মসজিদ পরিষ্কার যে করে তাদেরই আবার টয়লেট পরিষ্কারের কাজ করতে হয়। অতিরিক্ত কোনো সুইপার

থাকে না। শহরের পাশে গ্রামের ইমামদের অবস্থা আরও শোচনীয়।
খতিব, ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমের কাজ একাই করছেন। ইমাম হাফেজ মাওলানা আ. বারি বলেন, সামান্য বেতনে আছি। মসজিদের সব কাজ আমার সামাল দিতে হয়। খুব কষ্ট হয় এরপরও আছি। কমিটির কাছে জিম্মি হয়ে কেন চাকরি করেন

জানতে চাইলে ইমাম শিবলী হোসাইন বলেন, চাকরি থেকে সরিয়ে দিতে চাচ্ছে। কমিটির কাছে অন্য আলেম আমার বেতনের চেয়ে কম বেতনে চাকরি করতে চাচ্ছে। তাই কমিটির কিছু সদস্য তাকে রাখতে চায়। আমাকে বলে মসজিদে সারাক্ষণ বসে থাকবেন।

জোহরের পর কোথাও যাবেন না। সন্ধ্যার পর থেকে ফজর পর্যন্ত মসজিদ থেকে দেয়া রুমে অবস্থান করবেন। প্রতিবাদ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছি। অন্যান্য প্রায় সব ইমাম একই সমস্যায় ভুগছেন। কোনো কোনো সময় ইমামরা সম্মিলিত হয়ে অন্য ইমামকে পাগল উপাধি দিয়ে চাকরিচ্যুত করছেন। আমি আশ্চর্য হয়ে গেলাম। এক ইমামের সম্মান, অন্য ইমাম নষ্ট করছেন শুনে? চাকরির ভয়ে কমিটির মন রক্ষার ইমামতি করছে আজকের ইমাম। কমিটির সদস্যদের খুশি করার জন্য কোরআনের বহু সত্য কথা উচ্চারণ করেন না তারা। বহু বছর ইমামের দায়িত্ব পালন করে আসছেন হাফেজ কারি মাওলানা মোস্তফা কামাল জাবেরী। তিনি বলেন,

রাতে বালিশের নিচে চাকরি রেখে ঘুমাতে হয়। সকালে এসে কেউ চলে যেতে বললে চলে যেতে হয়। কমিটি থেকে অনুমতি নিয়ে কোথাও গেলে পরে সেই মসজিদে অন্য ইমাম নিয়োগ হয়। শূন্য হাতে বিনা অপরাধে বিদায় নিতে হয় ইমামকে। আসরের ইমাম বিদায় হলে মাগরিব ওয়াক্তে আরও স্বল্প বেতনে ইমাম নিয়োগ হয়ে যায়।

আজ যে কমিটি এক ইমামের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করল সে আপনার সঙ্গে করবে না এর নিশ্চয়তা কী? তাই ভেবেচিন্তে ইমামতি নিতে হবে। ইমামকে তার যোগ্যতার পাশাপাশি ইমামের গুণাবলি অর্জন করাসহ অতিরিক্ত কিছুদিন ইমাম হওয়ার প্রশিক্ষণ নেয়া জরুরি। সরকারের উচিত হতভাগা ইমামদের বিধিমালা কার্যকর করা।