ঘুমের মধ্যে নাক ডাকা ডেকে আনছে বড় বিপদ?

বাজার করে ফেরার পথে আচমকাই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন সিদ্দিকি সাহেব। শক্তসমর্থ, আজীবন ফিট থাকা মানুষটি কীভাবে হৃদরোগ বাঁধিয়ে বসলেন, তা ভেবে আশ্চর্য হয়েছিলেন পাড়া-পড়শিরা। শেষে জানা গেল, রোজ রাতে ঘুমের মধ্যে নাক ডাকতেন তিনি। সিদ্দিকি সাহেব অবশ্য সেটিকে গভীর ঘুমের লক্ষণ বলে গর্ব করলেও ওই নাক ডাকার মধ্যেই লুকিয়ে ছিল তাঁর রোগের কারণ!

নাক ডাকা মানেই বিপদ! শুনে আপনারা নিশ্চয়ই অবাক হচ্ছেন। নাক ডাকা যেমন অত্যন্ত সাধারণ একটি ঘটনা, তেমনই আপনার নাক ডাকা নিয়ে অভিযোগ জানাচ্ছেন আপনার বাড়ির লোক, এটিও কিন্তু একটি সাধারণ ঘটনা। আমার-আপনার বাড়িতে হামেশাই এরকম ঘটে থাকে। সমীক্ষা অনুযায়ী, পৃথিবীর প্রায় ৪৫% প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ মাঝে-মাঝেই ঘুমের মধ্যে নাক ডাকেন, এবং ২৫% মানুষ নিয়মিত নাক ডেকে থাকেন। এর মধ্যে প্রায় ৪০% প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ এবং ২৪% প্রাপ্তবয়স্ক মহিলাদের নিয়ম করে নাক ডাকার অভ্যেস রয়েছে।

রাতে ঘুমনোর সময় নাক ডাকাকে গভীর এবং ভাল ঘুমের লক্ষণ বলে ধরে নেওয়া হলেও ওই নিরীহ নাক ডাকার মধ্যেই বাসা বেঁধে থাকে বিপদের সম্ভাবনা। সাধারণত, নাক ডাকলে ঘুমের খুব সমস্যা না হলে সেটিকে আমল দিতে চান না অনেকেই। অথচ অনেকেই জানেন না, নাক ডাকা কার্যত ইঙ্গিত করে শারীরিক নানা সমস্যাকে। আজ সেই সমস্ত নিয়ে আমরা আলোচনা করব।

কেন ডাকে নাক? যারা নাক ডাকেন, তাঁরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া (ওএসএ)-তে ভোগেন, যেখানে ঘুমের সময় বায়ু চলাচলের স্থানে কোনও কারণে বাধার সৃষ্টি হয়। আর এর ফলেই সমস্যা হয় নিঃশ্বাসের। বায়ু চলাচল বাধাপ্রাপ্ত হওয়ার কারণে মস্তিষ্ক এবং শরীরের অন্যান্য নানা গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অক্সিজেনের যোগান ব্যহত হয়। এইরকম ক্ষেত্রে আমাদের শরীর ক্যাটেকোলামিনস এবং স্ট্রেস হরমোনকে সক্রিয় করে তোলে, যা আমাদের শারীরবৃত্তিয় কাজে বিশেষ প্রভাব ফেলে।

কাদের হয় স্লিপ অ্যাপনিয়া? সাধারণত মধ্যবয়স্ক, মোটা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া বেশি পরিমাণে দেখা গেলেও মহিলা ও শিশুদের, এমনকী, রোগা মানুষদের ক্ষেত্রেও এই রোগ ইদানীং দেখা যাচ্ছে।

নাক ডাকা ডেকে আনে হৃদরোগ! ওএসএ আপাত অর্থে নীরিহ হলেও তা নানা অসুস্থতার কারণ হতে পারে, ক্ষেত্রবিশেষে ডেকে আনতে পারে মৃত্যুও! সম্প্রতি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ওএসএ-র সঙ্গে হাইপারটেনশন, হৃদরোগ, মেলিটাস, স্ট্রোক ইত্যাদির সম্পর্ক নিবিড়। ওএসএ-র অন্যতম কারণ হল স্থূলতা। ওএসএ যাদের দেখা যায়, দিনের বেলাতেও তাঁরা ঘুমে ঢুলতে থাকেন। কাজে এনার্জি পান না। ফলে মনঃসংযোগের ব্যাঘাত ঘটে, গাড়ি চালাতে-চালাতেও দেখা যায় তাঁরা ঘুমে ঢুলছেন। এর

ফলে বাড়ে গাড়ি দুর্ঘটনার সম্ভাবনা। এছাড়া ওএসএ-র ফলে মুড সুইং, ডিপ্রেশন, বৈবাহিক জীবনে সমস্যা, যৌনতার ক্ষেত্রে সমস্যা, রাতে ঘনঘন মূত্রত্যাগ বা নকটার্নাল এনিউরেসিস ইত্যাদিও হতে পারে।

কীভাবে হয় নাক ডাকার চিকিৎসা? নাক ডাকার চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রথমেই নাক, গলা ও ল্যারিংসের বিশদ পরীক্ষা করা হয়। এর সঙ্গে বডি মাস ইনডেক্স এবং গলার পরিধি মেপে নেওয়া হয়। এরপর আপনার কী পরিমাণ ওএসএ-র রয়েছে, তার প্রকারভেদ বোঝার জন্য সারারাত জুড়ে ঘুমের পর্যবেক্ষণ বা পলিসোমনোগ্রাফি করা হয়। এছাড়া স্লিপ এন্ডোস্কোপি এবং ডায়ানামিক এমআরআই-ও করা হয়ে থাকে।

সাধারণত নাক ডাকার সমস্যায় পজিটিভ এয়ারওয়ে প্রেশার ডিভাইসকেই চিকিৎসার সেরা মাধ্যম বলে মনে করা হত। কিন্তু তিনবছরে ৪০%-এর কিছু উপরে এর সাফল্যের হার থাকার পর ইএনটি বিশেষজ্ঞদের নতুন কোনও উপায় বের করা আবশ্যিক হয়ে পড়েছে।

রেডিয়োফ্রিকোয়েন্সি এবং কোবলেশনের সাহায্যে নির্দিষ্ট অংশকে টার্গেট করে মাল্টি-লেভেল সার্জারি এখন অনেক বেশি সহজ, এতে দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠা যায়, ফলে অপারেশনের পরে হাসপাতালে কম থাকতে হয়। এর সঙ্গে ওজন কমানোর জন্য কঠোর কিছু উপায় মেনে চললে বা নিয়ম করে খাওয়া নিয়ন্ত্রণ করলেই এইসমস্ত চিকিৎসা নাক ডাকার লক্ষণ এবং অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া কমাতে সাহায্য করবে।

কিছু কার্যকরী পদক্ষেপ ২০১৮ সালের ২৫ মার্চ প্রাইমকেয়ার হসপিটালের ডিপার্টমেন্ট অফ ইএনটি, হেড অ্যান্ড নেক সার্জারি পুনের প্রখ্যাত সিনিয়র ইএনটি সার্জন এবং ‘ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন অফ সার্জনস ফর স্লিপ অ্যাপনিয়া’র প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রেসিডেন্ট ডাক্তার সীমাব শেখের সঙ্গে মিলে নাক ডাকা এবং স্লিপ অ্যাপনিয়ার উপর কন্টিনিউইয়িং মেডিকাল এডুকেশন (সিএমই) নামে একটি কার্যাবলী গ্রহণ করে। ডাক্তার সীমাব শেখ এই কার্যাবলীর গেস্ট ফ্যাকাল্টি হিসেবে নিয়োজিত। প্রায় ৫০ জন চিকিৎসক এই কার্যাবলীটি থেকে উপকৃত হয়েছেন।