অপেক্ষায় ‘শে’ষ ‘নিঃ’শ্বা’স, তবুও আসে না কেউ

‘ভাই আমি ভালো হয়ে গেছি, আমার বাড়িতে একটু খবর দিবেন’…! পাবনার ‘মা’ন’সিক হাসপাতালে গেলে এরকম কথা হাসপাতালের প্রায় ওয়ার্ড থেকেই শোনা যায়। অনেকের ধারণা ‘মা’নসি’ক ‘রো’গী’রা এমন বলেই থাকেন। কিন্তু চিকিৎসকরা শোনালেন ভিন্ন কথা।

তারা বললেন, ‘মা’ন’সিক ‘রো’গী’দে’র আত্মীয়-স্বজন এমনকি তাদের ভাই-বোনরাও পরিচয় দিতে ‘ল’জ্জা’বো’ধ করেন। এর কিছু সামাজিক ‘কা’র’ণ ও ‘কু’সং’স্কা’র রয়েছে। অনেকে পারিবারিক সম্পত্তি হাতিয়ে নেয়ার জন্যও ‘মা’ন’সি’ক ‘রো’গী’দে’র দূরে সরিয়ে রাখেন।

এক্ষেত্রে অধিকাংশ পরিবার একবার ‘রো’গী’ এখানে রেখে যেতে পারলে আর তার খোঁজ নিতে চান না। অনেকে ‘ভু’ল’ ঠিকানায় ‘রো’গী’ ভর্তি করিয়ে দিয়ে যান। ফলে রোগী সুস্থ হওয়ার পর কিংবা যাদের আর কখনো সুস্থ হওয়ার আশা নেই তাদের অভিভাবকদের কাছে ফিরিয়ে দিতে গেলে ঠিকানা খুঁজে পাওয়া যায় না। বছরের পর বছর যুগের পর যুগ ‘মা’ন’সি’ক হাসপাতালেই ‘কে’টে’ যাচ্ছে এরকম ‘রো’গী’ ২১ জন। তারা শুধু অপেক্ষা করেন কেউ তাদের ঠিকই একদিন নিতে আসবে। কিন্তু তাদের কেউ আর নিতে আসেন না। অনেকেই অপেক্ষা করতে করতে এখানেই শেষ নিঃশ্বাস ‘ত্যা’গ’ করেন। ২০১৫ সালে এমনভাবে ‘মা’রা’ গেছেন দু’জন।

‘মা’ন’সি’ক’ হাসপাতালের ৫ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ‘মা’ন’সি’ক ‘রো’গী’ সাইদ হোসেন। ভর্তি রেজিস্ট্রার অনুযায়ী তাকে ১৯৯৬ সালে ভর্তি করে যান তার স্বজনরা। তিনি অনেক আগে সুস্থ হলেও কেউ নিতে আসেননি। তাই তিনি বছরের পর বছর হাসপাতালে ‘ব’ন্দি’ রয়ে গেছেন। তিনি জানান, খুব ইচ্ছে করে বাসায় যেতে কিন্তু কেউ নিতে আসে না।

মিনহাজ উদ্দিন। গত ১৫ বছর ধরে ‘পা’ব’না’ ‘মা’ন’সি’ক’ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ২০০৩ সাল থেকে হাসপাতালের রেকর্ডে তার নাম আছে। জটিল ‘মা’ন’সি’ক ‘রো’গে’ ‘আ’ক্রা’ন্ত’ হওয়ার পর মনিরুলের পরিবার তার কাছ থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছিল। ফলে ‘মা’ন’সি’ক’ হাসপাতালে তাকে ‘ভ’র্তি’ করিয়ে নিজেদের দায় সেরেছে। একটি ‘ভু’য়া’ ঠিকানা দিয়ে ২০০৩ সালে তাকে ভর্তি করানোর পর থেকে পরিবারের আর কোনো খোঁজ নেই।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে যে ঠিকানা রয়েছে সেখানে তারা বেশ কয়েকবার খোঁজ নিয়েছেন। কিন্তু সে ঠিকানায় মিনহাজ উদ্দিনের কোনো আত্মীয়-স্বজনের খোঁজ মেলেনি। এ হাসপাতালে কবে এসেছেন? এমন প্রশ্নে মিনহাজ উদ্দিন শুধু বলেন, ‘অনেক আগে।’ এর বেশি কিছু তিনি আর বলতে পারেন না। তিনি বাড়ি ফিরতে চান। কিন্তু ফেরার কোনো জায়গা নেই তার। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে ৪৫ বছর বয়সী মিনহাজ উদ্দিনের বাকি জীবনও পাবনার মানসিক হাসপাতালে ‘ব’ন্ধ’ ঘরের মধ্যেই কাটবে।

সুস্থ হয়েও বাড়ি যেতে না পারার বেদনা এভাবেই ব্যক্ত করেন সাইদ, মিনহাজের মতো আরো ২১ জন রোগী যারা এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েও বাড়ি ফিরে যেতে পারছেন না। এদের কারো ঠিকানা ভুল, আবার কোনো অভিভাবক বা পরিবার তাদের নিতেও রাজি নয় বলে ঠিকানা পরিবর্তন করেছেন।

পাবনা ‘মা’ন’সি’ক হাসপাতালের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক তন্ময় প্রকাশ বিশ্বাস বলেন, বাংলাদেশের সমাজে জটিল ‘মা’ন’সি’ক ‘রো’গে’ যারা আক্রান্ত হন, তাদের প্রতি পরিবার এবং সমাজের কেমন দৃষ্টিভঙ্গি থাকে, তা সাইদ বা মিনহাজের অবস্থা থেকে বোঝা যায়। অনেক সময় মানুষের কষ্ট নিয়ে সেটিতে হাস্যরস মিশিয়ে উড়িয়ে দেয়ার প্রবণতা দেখা যায় সমাজে। এজন্য সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি একটি বড় কারণ বলে মনে করেন তিনি।

মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তন্ময় প্রকাশ বিশ্বাস বলেন, মানসিক হাসপাতালগুলোতে যারা চিকিৎসা নিচ্ছেন প্রত্যেকের জীবনের একটি করে করুণ গল্প আছে, যার ফলে তারা মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছেন। কেউ প্রেমে ব্যর্থ, কেউ পারিবারিক অশান্তি, পেশাগত জীবনে কাঙ্খিত ফলাফল না পাওয়া কিংবা মাদকাসক্তি- এসব বিষয় তাদের মনে তীব্র আঘাত দিয়েছে।

পাবনা মানসিক হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক তন্ময় প্রকাশ বিশ্বাস বলেন, যারা সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন তাদের মধ্যে ৯০ শতাংশ কিংবা তার চেয়ে বেশি আবারো পুনরায় মানসিক রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।

তিনি আরো বলেন, রোগটি পুনরায় ফিরে আসার কারণ দুটি। একটি হচ্ছে- রোগীর সঙ্গে তার পরিবার এবং সমাজ যথাযথ ব্যবহার না করা এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে, ওষুধ ঠিক মতো না খাওয়া। তাকে একজন সাধারণ মানুষের মতো দেখতে হবে। তার মতামতকে মূল্য দিতে হবে। কিন্তু আমাদের সমাজে উল্টোটি দেখা যায়।

তিনি মনিরুল ইসলাম নামে একজন রোগীর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, মনিরুলের মতো অনেক মানসিক রোগী এখানে আসেন এবং চিকিৎসা শেষে ফিরে যান। কিন্তু ফিরে যাওয়ার পর পরিবার এবং সমাজ তাদের যে দৃষ্টিতে দেখে সেটি তাদের জন্য আরো বিব্রতকর। ফলে হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরে যাওয়ার পর একই সমস্যায় তারা আবারো আক্রান্ত হন। যেমনটি মনিরুল হয়েছেন।

হাসপাতালের পরিসংখ্যান শাখার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন বলেন, ১৯৫৭ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত আবাসিকে রোগী ভর্তি হয়েছেন ৭৯ হাজার ৪৪৪ জন। তাদের মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৬৬ হাজার ৭৯০ জন। বহির্বিভাগে চিকিৎসা নেয়ার সংখ্যা আরো বেশি। ২০০৯ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন ২ লাখ ৭৫ হাজার ৫৫৬ জন। এরমধ্যে নারী ছিলেন ১ লাখ ৫১ হাজার ৩৮৯ জন, পুরুষ ১ লাখ ২৪ হাজার ১৬৭ জন।

পাবনা মানসিক হাসপাতলের পরিচালক ডা. এটিএম মোর্শেদ জানান, হাসপাতালের বহির্বিভাগে গত ১০ বছরে চিকিৎসা নিয়েছেন ৫ লাখেরও বেশি, যার মধ্যে নারী-পুরুষ রোগীর সংখ্যা প্রায় সমান। প্রতি বছরে আউটডোরে ২৫-৩০ হাজার রোগী এবং আন্তঃবিভাগে এক হাজার- ১২শ’ রোগীর চিকিৎসা করানো হচ্ছে।