সিঙ্গেল ফাদার ফেরদৌস

আমা’র স্ত্রী’’ তানিয়া বৈমানিক সেটা হয়তো অনেকেই জানে। ও লন্ডন ফ্লাইট করে এসে ১৫ দিন গুলশানের ফ্ল্যাটে ছিল।

গণমাধ্যমে অনেকে ভুল তথ্য দিয়েছে, সে করো’নায় আ’ক্রান্ত ছিল না। তানিয়া সুস্থ ও সচেতন মানুষ। সরকারি স্বাস্থ্যবিধি মেনেই কোয়ারেন্টিনে ছিল।

আমাদের মধ্যে সামাজিক দূরত্ব ছিল, কিন্তু মানসিক দূরত্ব না। ১৫টা দিন সবার স্বার্থে আম’রা আলাদা ছিলাম। ও যদি বাসায় চলে আসত কারো হয়তো কিছু বলার ছিল না। কিন্তু সে ক্ষেত্রে আম’রা নিজেদের সচেতন নাগরিক বলতে পারতাম না।

এই বোধ সবার মধ্যে থাকতে হবে। এ সপ্তাহেই ওর ১৫ দিন শেষ হলো। এখন আম’রা একসঙ্গে আছি। বাসায় সবাই কোয়ারেন্টিনে আছি।

ও যত দিন বাসায় ছিল না আমি ও আমা’র বাচ্চারা অনেকটাই স্বাধীন ছিলাম। কারণ বাসার বস তো সে, তার নিয়ম-কানুন মানতেই হয় আমাদের। এই সময় নিয়ম-কানুন কিছুটা শিথিল ছিল। যদিও ভিডিওকলে সব কিছু অবজার্ভ করত সে।

আমাদের জন্য অবশ্য এটা নতুন কিছু না। তানিয়া ফ্লাইটে চলে গেলে বাচ্চারা আমা’র সঙ্গে থাকে। আবার আমি শুটিংয়ে চলে গেলে ওর মা ওদের সঙ্গে থাকে। দুজন এভাবেই ওদের বড় করছি। এবার যেটা হয়েছে একদমই ঘরের বাইরে যেতে পারিনি। ২৪ ঘণ্টাই সময় পেয়েছি ওদের দেখভাল করার।

সকালে উঠেই ছোট মে’য়ে নামিরার দাঁত ব্রাশ করাতে হতো। তারপর সকালের নাশতা। দুই মে’য়েই আমাকে হেল্প করত। নাশতা শেষে ওদের হোমওয়ার্ক করাতাম। অনলাইনে ক্লাস চলছে ওদের। সেই নোটগুলো নিয়ে ওদের সাহায্য করার চেষ্টা করতাম।

নামিরা দ্বিতীয় শ্রেণিতে আর নুযহাত পড়ছে সপ্তম শ্রেণিতে, দুজনই সানবিম স্কুলে। স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে আমি কৃতজ্ঞ, ওদের বেশ আত্মনির্ভরশীল করে তুলেছে। নিজেদের কাজ ওরা নিজেরাই করতে পারে।

এর মধ্যেই দুপুর হয়ে যেত। দুজনকে আমি টাইম করে দিয়েছিলাম কে কতক্ষণ টিভি দেখবে, কে কতক্ষণ নেটফ্লিক্স দেখতে পারবে। এরপর রান্না করতাম। দুপুরের খাবারের পর হয়তো একটু ভাতঘুম। বিকেলে উঠে একসঙ্গে লুডুসহ আরো কিছু খেলা খেলেছি।

ইউটিউব দেখে বাবা-মে’য়ে মিলে ডান্স প্র্যাকটিস করতাম। সন্ধ্যার পর নিজেকে কিছুটা সময় দিতাম। আমা’র হাতে যে কাজগুলো জমত সেগুলো করতাম। শেষ করে ওদের ইস’লামী জ্ঞান দেওয়ার চেষ্টা করতাম। ওরা নামাজ পড়তে পারে। রাতে একসঙ্গে কোনো একটা হাসির বা র’হস্য সিনেমা দেখতাম।

এ সময়ে মানুষের পাশে যতটা দাঁড়ানো যায় ঘরে বসেই সেই চেষ্টা করেছি। খবর দেখতাম। করো’নায় করণীয় বিষয়গুলো ওদের বোঝাতাম। ওরা একটু অ’বাক হতো কেন বাসায় কেউ আসে না, মা কেন দূরে আছে। তানিয়া তো সারাক্ষণই ভিডিওকলে ওদের সঙ্গে কথা বলত।

কী’’ কী’’ করতে হবে বুঝিয়ে দিত। সময়মতো গোসলের তাড়া দেওয়া, গোসলের পর ওদের চুল শুকাতে হয়। এগুলো কিভাবে করতে হয় সেটা আমি জানতাম না। তানিয়া শিখিয়ে দিত। নুযহাত বেশ ভালো রান্নাও শিখে গেছে। আম’রা পিত্জা, পাস্তাসহ নানা আইটেমের খাবার তৈরির চেষ্টা করতাম। নুযহাত এ ক্ষেত্রে বেশ দক্ষ।

অনেক বছর একসঙ্গে এমনভাবে থাকা হয়নি। হয়তো রাতে এসে দেখতাম ওরা ঘুমিয়ে গেছে। হয়তো যেদিন আমা’র ছুটি, ওদের সেদিন পড়াশোনার চাপ। সুন্দর সময় কা’টানো হতো দেশের বাইরে গেলে, কিন্তু এবার সেটা বাসাতেই হলো।