রোজিনা ইসলামের মুক্তি চাই, প্রতিবাদ হোক দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে…

রোজিনা ইসলাম, এ সময়ের একজন অন্যতম অনুসন্ধানী সাংবাদিক। তাঁকে পাঁচ ঘণ্টার অধিক আটকে রেখে, মামলা করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা, চোর যে ভয়ংকর অবস্থা তৈরি করেছেন, তা দেখে বিস্মিত দেশ-বিদেশের সভ্য সমাজ।

স্বাস্থ্য খাত নিয়ে রোজিনা ইসলামের সাম্প্রতিক কিছু প্রতিবেদন দেখলেই বোঝা যায় তাঁর প্রতি দুর্নীতিবাজদের ক্ষোভটা কোথায়। নিয়োগে অনিয়মসহ স্বাস্থ্য খাতের নানা অনিয়ম নিয়ে রোজিনা ইসলাম সিরিজ রিপোর্ট করেছেন দীর্ঘ সময় ধরে। তাঁর অনুসন্ধানী রিপোর্টে কাদের মুখোশ উন্মোচিত হয়েছিল, এগুলো বুঝতে কারোরই অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। আর এসব রিপোর্ট করতে নিশ্চয় কোনো সচিব কিংবা উপসচিব রোজিনা ইসলামের হাতে তথ্য দিয়ে বলেননি, এই নিন, এটা নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করুন। অথচ তথ্য বের করে আনার এ বিষয়কে এখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতিবাজ চক্রটি চুরি বলে আখ্যায়িত করছে, সঙ্গে সায় দিচ্ছে রাষ্ট্রযন্ত্র।

কত সহজ করে একজন খ্যাতনামা সাংবাদিককে চোর বানানোর চেষ্টা চলছে। মন্ত্রণালয়ে নিশ্চয় এমনি এমনি কেউ প্রবেশ করতে পারেন না। প্রবেশ করা গেলেও একটি খোলা রুমে এমন চাঞ্চল্যকর কোনো কিছু কেউ ফেলে রাখবে না, যা চুরি করে নিয়ে প্রকাশ করলে রাষ্ট্রযন্ত্রের মহাক্ষতি হয়ে যাবে। আর এটা অন্তত বোধগম্য হওয়ার মতো সাধারণ জ্ঞান দেশের জনগণের রয়েছে। দেশের ১৬–১৭ কোটি মানুষ জানে—চুরি কারা করে, কারা চোর। অতএব ওই দিকে যাচ্ছি না।

যাচ্ছি, একজন সাংবাদিক এ তথ্য চুরি কেন করেন কিংবা এই তথ্য চুরি করে কী করতে পারেন। বিষয়টি খুবই সাধারণ, একজন পেশাদার সাংবাদিক ওই তথ্যে যদি দুর্নীতি, লুটতরাজের মতো কিছু থাকে তাহলে জনগণের সামনে তুলে ধরেন। রোজিনা ইসলাম এ পর্যন্ত যেসব অসংগতি, দুর্নীতির চিত্র জনগণের সামনে তুলে ধরেছেন, সেগুলোর সবই কাঠখড় পুড়িয়ে বের করে আনা তথ্য, যা বস্তুনিষ্ঠ এবং জনগণের মঙ্গলময়।

কিন্তু দুর্নীতিবাজরা জনগণের এ মঙ্গলময় কাজের সৈনিকদের প্রতিনিয়তই গলা চেপে ধরছে এবং গতকাল রোজিনা ইসলামের গলা আক্ষরিক অর্থেই চেপে ধরেছিলেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন এবং এখন পর্যন্ত ওই গং যা করছে তাতে মনে হচ্ছে আমাদের রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো জবাবহীনতার এমন এক পর্যায়ে চলে গেছে যে কোনো কিছুতেই আর ভয় নেই তাদের।

তা না হলে এই করোনা মহামারিতে মানুষ মরতে মরতে বেঁচে আছে, বাঁচতে চেয়ে মরে গেছে। আর স্বাস্থ্য খাতের প্রমাণিত দুর্নীতিবাজরা বসে বসে লুটপাট করছেন। আর কেউ এগুলোর কিঞ্চিত প্রকাশ করলেই রাষ্ট্রের গোপনীয়তার দোহায় দিয়ে চোর বানিয়ে নির্যাতন, থানা-হাজত, কোর্ট-কাছারি করাচ্ছেন। এখন একবার ভেবে জবাব দিন, দুর্নীতির তথ্য সংগ্রহ যা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মতে চুরির অভিযোগে যদি একজন সাংবাদিককে জেলে যেতে হয়, তাহলে যাঁরা স্বাস্থ্য খাতের হাজার কোটি টাকা লুটপাট করছেন, তাঁদের কী সাজা হওয়া উচিত?

প্রশ্ন আসবে, কোন আইনে সরকারি অফিসের একজন দেশের একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের গলা চেপে ধরলেন, কোন আইনে দেশের একজন খ্যাতিমান সাংবাদিককে নির্যাতন করলেন? কেন একজন মানুষ অসুস্থ হওয়ার পরও তাঁকে হাসপাতালে না নিয়ে হাজতে নেওয়া হলো? প্রশ্ন আরও আসবে।

আমরা জানি, আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগ, তারপরেই স্বাধীন সংবাদমাধ্যম। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। রাষ্ট্র যদি এই স্তম্ভ নিজেই ভেঙে ফেলে তাহলে কিন্তু ক্ষতিটা রাষ্ট্রেরই। আমি অস্ট্রেলিয়ায় বাস করি। এখানে দেখি রাষ্ট্র কত যত্ন করে এই চতুর্থ স্তম্ভটি টিকিয়ে রাখে জাতির নিজস্ব স্বার্থেই। দেখি, রাষ্ট্র আগ বাড়িয়ে এই চতুর্থ স্তম্ভটির প্রতিষ্ঠান-কর্মীদের বাঁচিয়ে রাখতে দেশ-বিদেশের সঙ্গে দেনদরবার করে অনেক ছোট ইস্যুতে। তারপরও এসব দেশে যে সাংবাদিকদের সঙ্গে কখনো জটিলতা তৈরি যে হয় না, তা কিন্তু নয়। তবে তাঁরা শোধরে নেয় অবিলম্বে। স্বাধীন গণমাধ্যম সূচকে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৫২তম। দক্ষিণ এশিয়ার মতো দেশগুলোর মধ্যেও সবচেয়ে পিছিয়ে বাংলাদেশ।

সুতরাং সাধু সাবধান, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের ফাঁদে পা না দিয়ে সরকার যেন রোজিনা ইসলামকে অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তি দেয় এবং তাঁর সঙ্গে সংঘটিত অপরাধের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করে, এটাই আমরা চাই।
লেখক: অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন আইনজীবী, অস্ট্রেলিয়া