বাংলাদেশের ‘কাকলী ফার্নিচার’ যেভাবে কলকাতায় সুপারহিট!

বাংলাদেশে বলতে গেলে একটি নেহায়েতই অল্প-পরিচিত আসবাবপত্র বিপণির নাম ‘কাকলী ফার্নিচার’। কিন্তু ফেসবুকে সাদামাটা অথচ নজরকাড়া এক বিজ্ঞাপনের সুবাদে রাতারাতি সীমান্তের অন্য পাড়ে তারা রীতিমতো আলোড়ন ফেলে দিয়েছে। গত দু’দিনে কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গে কাকলি ফার্নিচার নিয়ে শত শত মিম তৈরি হয়েছে, সবার মুখে মুখে ঘুরছে এই ব্র্যান্ডটির নাম।

বিনোদন জগতের তারকা থেকে সাধারণ মানুষ, কাকলী ফার্নিচার নিয়ে টিকাটিপ্পনি বা পোস্ট করতে কেউই পিছিয়ে নেই। ‘দামে কম, মানে ভালো’- এই যে স্লোগানটি কাকলী ফার্নিচারের বিজ্ঞাপনে ব্যবহৃত হয়েছে সেটিও এখন পশ্চিমবঙ্গে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে!

ওই রাজ্যে ভোটের ঠিক আগে প্রবল মাতামাতি শুরু হয়েছিল নারায়ণগঞ্জের ডাকাবুকো আওয়ামী লীগ নেতা শামীম ওসমানের থেকে ধার করা স্লোগান ‘খেলা হবে’ নিয়ে। পশ্চিমবঙ্গের গোটা ভোটপর্ব জুড়েই দাপট দেখিয়েছে সেই ‘খেলা হবে’, যার আঁচ এড়াতে পারেননি মমতা ব্যানার্জি বা নরেন্দ্র মোদি কেউ

সেই ভোট মিটতে না মিটতেই প্রতিবেশী বাংলাদেশের একটি নিরীহ ফার্নিচার ব্র্যান্ড আবার পশ্চিমবঙ্গে হইচই ফেলে দিয়েছে। গুগলে, টুইটারে, ফেসবুকে সর্বত্র ট্রেন্ড করছে ‘কাকলী ফার্নিচার’ ও তার নানা ‘ভ্যারিয়েন্ট’।

কিন্তু এই সাদামাটা আসবাবের দোকানটি এভাবে পশ্চিমবঙ্গে আলোড়ন ফেললো কীভাবে?

কলকাতার একটি নামি বিজ্ঞাপন সংস্থার বড় কর্তা শৌনক মিত্র মনে করেন, বাংলাদেশের ওই ব্র্যান্ডটি ফেসবুকে তাদের বিজ্ঞাপনে যে অদ্ভুত একটা সারল্য ও তার পাশাপাশি একটা ইঙ্গিতপূর্ণ মেজাজ ধরতে পেরেছে – সেখানেই এটি কলকাতার মন জয় করে ফেলেছে!

শৌনক মিত্র বাংলা ট্রিবিউনকে বলছিলেন, “বিজ্ঞাপনের প্রথম অংশে একজন পুরুষ ও মহিলা কাকলী ফার্নিচারের গুণাগুণ নিয়ে কথা বলে যাচ্ছেন অদ্ভুত মজার ভঙ্গিতে। আসবাবগুলো কত টেকসই, কত ভালো মানের, পুরুষটি এসব পরপর বলে যাচ্ছেন গরগর করে। আর এক নারী ক্রমাগত জিজ্ঞাসা করে যাচ্ছেন, ‘আর? আর?’ এখানেই বিজ্ঞাপনটা নজর কেড়ে নিয়েছে।”

‘তারপরই আমরা দেখছি দুটো বাচ্চা মেয়ে পাশাপাশি কাকলীর দুটো রকিং সোফায় বসে যান্ত্রিকভাবে দুলে যাচ্ছে, আর সোফার ওপর লাফালাফি করছে নিশ্চিন্তে। ওই নিষ্পাপ সারল্যটাই কাকলির হয়ে বাকি বাজিমাতটা করেছে!’

এর পরিণতি হয়েছে এই- কলকাতা বা পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের মধ্যে কাকলী ফার্নিচার নিয়ে ‘মিম’ বানানোর কিংবা সেগুলো শেয়ার করার, ফরোয়ার্ড করার ধুম পড়ে গেছে। আনন্দবাজার পত্রিকা তো একে ‘গণসংক্রমণ’ বলতেও দ্বিধা করেনি।

কাকলী ফার্নিচার নিয়ে মিমে বাদ যাননি মিস্টার বিন, টিনটিন সিরিজের প্রফেসর ক্যালকুলাস, সত্যজিৎ রায়ের জয় বাবা ফেলুনাথের ভিলেন মগনলাল মেঘরাজ (উৎপল দত্ত), কিংবা টিভির জনপ্রিয় ধারাবাহিক সিআইডি’র চরিত্ররাও।

কাকলী ফার্নিচার যেহেতু দাবি করেছে তাদের তৈরি খাট কিছুতেই ভাঙে না, তাই যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ নানা পোস্টও তৈরি হয়ে গেছে এরমধ্যেই। তার একটি আবার এরকম:

”নুইয়ে যাবে শরীরের ২০৭ নম্বর হাড়,

থমকে যাবে চিৎকার,

তবু ভাঙবে না কাকলী ফার্নিচার।”

তৃণমূল কংগ্রসের এমপি তথা জাতীয় মুখপাত্র কাকলী ঘোষ দস্তিদারকে একটু বেশিই মূল্য চোকাতে হচ্ছে কাকলি ফার্নিচারের এই হঠাৎ জনপ্রিয়তার জন্য। নারদা স্টিং অপারেশনে অন্যদের সঙ্গে তাকেও যেহেতু হাতে করে ‘ঘুষ’ নিতে দেখা গিয়েছিল, তাই অনেক মিমের কেন্দ্রীয় চরিত্র তিনি… সঙ্গে স্লোগানটা একটু পাল্টে দেওয়া হয়েছে, ‘মানে কম, দামে ভালো’!

চিত্র পরিচালক অনীক দত্ত ব্যঙ্গ করেই লিখেছেন, ‘ঘুষ দস্তিদার শুনসি আগে। এখন শুনসি কাকলী ফার্নিচারস!’

সংগীতকার জয় সরকারও ফেসবুকে কাকলী ফার্নিচার নিয়ে মজাদার পোস্ট করেছেন নিজের ওয়ালে।

আর এক চিত্র পরিচালক শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় আবার মনে করে দিয়েছেন, কাকলী ফার্নিচারেরও অনেক আগে, ২০১৮ সালে তার ‘হামি’ ছবিতে আর একটি ফার্নিচার ব্র্যান্ডও তুমুল জনপ্রিয় হয়েছিল। সেটি হলো বিশ্বাস ফার্নিচার। ওই দোকানের মালিক লাল্টু বিশ্বাসের ভূমিকায় ছবিতে অভিনয় করেছিলেন শিবপ্রসাদ নিজেই।

কিন্তু আপাতত এই করোনার মহাবিপদের মধ্যেও কলকাতার মন জয় করে নিয়েছে বাংলাদেশের কাকলী ফার্নিচারস। মহামারির এই চরম সংকটেও শহরের মুখে এক চিলতে হাসি ফোটাচ্ছে আসবাবপত্রের এই অজানা দোকানটি!